2:44 am, Sunday, 24 May 2026

ভারতে ‘তেলাপোকা পার্টির’ পর এবার আত্মপ্রকাশ করল ‘পরজীবী ফ্রন্ট’

ভারতের তরুণদের অনলাইন দুনিয়ায় নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে দুটি ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক গোষ্ঠী— ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) এবং ‘ন্যাশনাল প্যারাসাইটিক ফ্রন্ট’ (এনপিএফ)। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক এই দুই সংগঠন নিজেদের রাজনৈতিক ব্যঙ্গ আন্দোলনের অংশ হিসেবে তুলে ধরছে। তবে মজার আড়ালে তারা তুলে ধরছে বেকারত্ব, রাজনৈতিক হতাশা ও প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যের মতো গুরুতর বাস্তবতা।

ঘটনার সূত্রপাত ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি মন্তব্যকে ঘিরে। তিনি এক শুনানিতে মন্তব্য করেছিলেন, কিছু বেকার তরুণ-তরুণী “আরশোলার মতো আচরণ” করেন। পরে তিনি দাবি করেন, বক্তব্যটি ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে এবং তিনি মূলত ভুয়া ডিগ্রিধারীদের প্রসঙ্গ তুলেছিলেন। কিন্তু এরই মধ্যে মন্তব্যটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া ছড়িয়ে পড়ে।

এরপরই জন্ম নেয় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’। নিজেদের তারা “অলস ও বেকারদের কণ্ঠস্বর” হিসেবে পরিচয় দেয়। দলের সদর দপ্তর বলা হয়েছে— “যেখানেই ওয়াইফাই কাজ করে।” সদস্য হওয়ার শর্তও ব্যঙ্গাত্মক— বেকার, অলস, সারাক্ষণ অনলাইনে থাকা এবং পেশাগত ক্ষোভ প্রকাশের ক্ষমতা থাকতে হবে। শুরু হওয়ার মাত্র দুই দিনের মধ্যেই ৪০ হাজারের বেশি সদস্য নিবন্ধন করেন।

দলটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে, যিনি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ে জনসংযোগ বিষয়ে পড়াশোনা করছেন। তিনি আগে আম আদমি পার্টির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টিমেও কাজ করেছেন। তার একটি মজার পোস্ট— “যদি সব আরশোলা একজোট হয়?”— থেকেই এই আন্দোলনের সূচনা।

বর্তমানে ইনস্টাগ্রামে সিজেপির অনুসারীর সংখ্যা ৯০ লাখ ছাড়িয়েছে, যা ভারতের অনেক মূলধারার রাজনৈতিক দলের অনুসারীর সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে। তবে জনপ্রিয়তা বাড়তেই এক্স (সাবেক টুইটার) প্ল্যাটফর্মে তাদের অ্যাকাউন্ট ব্লক করা হয়েছে।

অন্যদিকে, সিজেপির প্রতিপক্ষ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে ‘ন্যাশনাল প্যারাসাইটিক ফ্রন্ট’ বা এনপিএফ। তারাও নিজেদের রাজনৈতিক ব্যঙ্গ সংগঠন হিসেবে পরিচয় দেয়। তাদের দাবি, তারা এমন নাগরিকদের প্রতিনিধিত্ব করে যারা “শাসনব্যবস্থাকে নাটক হিসেবে মেনে নিতে রাজি নয়।”

এনপিএফের ভাষ্য অনুযায়ী, সমাজের প্রকৃত “পরজীবী” কারা— সেই প্রশ্ন তোলাই তাদের উদ্দেশ্য। তারা বিদ্রূপাত্মক ভাষায় বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সাধারণ মানুষের বঞ্চনাকে তুলে ধরছে।

দুই দলেরই রয়েছে নিজস্ব “নির্বাচনী ইশতেহার”। সিজেপি নিজেদের “ধর্মনিরপেক্ষ, সমাজতান্ত্রিক, গণতান্ত্রিক এবং অলস” দল হিসেবে পরিচয় দিয়েছে। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে— প্রধান বিচারপতিদের অবসর-পরবর্তী রাজ্যসভার আসনে নিষেধাজ্ঞা, সংসদে নারীদের ৫০ শতাংশ প্রতিনিধিত্ব এবং দলবদলকারী এমপি-এমএলএদের ২০ বছরের জন্য নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা।

অন্যদিকে, এনপিএফ নিজেদের এমন এক গোষ্ঠী হিসেবে তুলে ধরেছে যারা “ভাঙা ব্যবস্থার ভেতর থেকেই সেটিকে বদলাতে চায়।” তাদের বক্তব্যে রাজনৈতিক সুবিধাভোগী ও ক্ষমতাবান শ্রেণির বিরুদ্ধে তীব্র বিদ্রূপ লক্ষ্য করা যায়।

বিশ্লেষকদের মতে, সিজেপি ও এনপিএফ মূলত তরুণ প্রজন্মের হতাশা, ক্ষোভ ও রাজনৈতিক অনাস্থার বহিঃপ্রকাশ। যদিও তারা আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক দল নয়, তবুও সামাজিক মাধ্যমে তাদের জনপ্রিয়তা প্রমাণ করছে যে ব্যঙ্গ ও মিম এখন তরুণদের রাজনৈতিক ভাষার অংশ হয়ে উঠেছে।

শু/সবা
Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

five × three =

About Author Information

Popular Post

গাজা যুদ্ধকালীন ইসরায়েলকে যেভাবে অস্ত্র জুগিয়েছে ৫১টি দেশ

ভারতে ‘তেলাপোকা পার্টির’ পর এবার আত্মপ্রকাশ করল ‘পরজীবী ফ্রন্ট’

Update Time : ০৫:৩৬:৪৯ pm, Friday, ২২ মে ২০২৬

ভারতের তরুণদের অনলাইন দুনিয়ায় নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে দুটি ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক গোষ্ঠী— ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) এবং ‘ন্যাশনাল প্যারাসাইটিক ফ্রন্ট’ (এনপিএফ)। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক এই দুই সংগঠন নিজেদের রাজনৈতিক ব্যঙ্গ আন্দোলনের অংশ হিসেবে তুলে ধরছে। তবে মজার আড়ালে তারা তুলে ধরছে বেকারত্ব, রাজনৈতিক হতাশা ও প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যের মতো গুরুতর বাস্তবতা।

ঘটনার সূত্রপাত ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি মন্তব্যকে ঘিরে। তিনি এক শুনানিতে মন্তব্য করেছিলেন, কিছু বেকার তরুণ-তরুণী “আরশোলার মতো আচরণ” করেন। পরে তিনি দাবি করেন, বক্তব্যটি ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে এবং তিনি মূলত ভুয়া ডিগ্রিধারীদের প্রসঙ্গ তুলেছিলেন। কিন্তু এরই মধ্যে মন্তব্যটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া ছড়িয়ে পড়ে।

এরপরই জন্ম নেয় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’। নিজেদের তারা “অলস ও বেকারদের কণ্ঠস্বর” হিসেবে পরিচয় দেয়। দলের সদর দপ্তর বলা হয়েছে— “যেখানেই ওয়াইফাই কাজ করে।” সদস্য হওয়ার শর্তও ব্যঙ্গাত্মক— বেকার, অলস, সারাক্ষণ অনলাইনে থাকা এবং পেশাগত ক্ষোভ প্রকাশের ক্ষমতা থাকতে হবে। শুরু হওয়ার মাত্র দুই দিনের মধ্যেই ৪০ হাজারের বেশি সদস্য নিবন্ধন করেন।

দলটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে, যিনি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ে জনসংযোগ বিষয়ে পড়াশোনা করছেন। তিনি আগে আম আদমি পার্টির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টিমেও কাজ করেছেন। তার একটি মজার পোস্ট— “যদি সব আরশোলা একজোট হয়?”— থেকেই এই আন্দোলনের সূচনা।

বর্তমানে ইনস্টাগ্রামে সিজেপির অনুসারীর সংখ্যা ৯০ লাখ ছাড়িয়েছে, যা ভারতের অনেক মূলধারার রাজনৈতিক দলের অনুসারীর সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে। তবে জনপ্রিয়তা বাড়তেই এক্স (সাবেক টুইটার) প্ল্যাটফর্মে তাদের অ্যাকাউন্ট ব্লক করা হয়েছে।

অন্যদিকে, সিজেপির প্রতিপক্ষ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে ‘ন্যাশনাল প্যারাসাইটিক ফ্রন্ট’ বা এনপিএফ। তারাও নিজেদের রাজনৈতিক ব্যঙ্গ সংগঠন হিসেবে পরিচয় দেয়। তাদের দাবি, তারা এমন নাগরিকদের প্রতিনিধিত্ব করে যারা “শাসনব্যবস্থাকে নাটক হিসেবে মেনে নিতে রাজি নয়।”

এনপিএফের ভাষ্য অনুযায়ী, সমাজের প্রকৃত “পরজীবী” কারা— সেই প্রশ্ন তোলাই তাদের উদ্দেশ্য। তারা বিদ্রূপাত্মক ভাষায় বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সাধারণ মানুষের বঞ্চনাকে তুলে ধরছে।

দুই দলেরই রয়েছে নিজস্ব “নির্বাচনী ইশতেহার”। সিজেপি নিজেদের “ধর্মনিরপেক্ষ, সমাজতান্ত্রিক, গণতান্ত্রিক এবং অলস” দল হিসেবে পরিচয় দিয়েছে। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে— প্রধান বিচারপতিদের অবসর-পরবর্তী রাজ্যসভার আসনে নিষেধাজ্ঞা, সংসদে নারীদের ৫০ শতাংশ প্রতিনিধিত্ব এবং দলবদলকারী এমপি-এমএলএদের ২০ বছরের জন্য নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা।

অন্যদিকে, এনপিএফ নিজেদের এমন এক গোষ্ঠী হিসেবে তুলে ধরেছে যারা “ভাঙা ব্যবস্থার ভেতর থেকেই সেটিকে বদলাতে চায়।” তাদের বক্তব্যে রাজনৈতিক সুবিধাভোগী ও ক্ষমতাবান শ্রেণির বিরুদ্ধে তীব্র বিদ্রূপ লক্ষ্য করা যায়।

বিশ্লেষকদের মতে, সিজেপি ও এনপিএফ মূলত তরুণ প্রজন্মের হতাশা, ক্ষোভ ও রাজনৈতিক অনাস্থার বহিঃপ্রকাশ। যদিও তারা আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক দল নয়, তবুও সামাজিক মাধ্যমে তাদের জনপ্রিয়তা প্রমাণ করছে যে ব্যঙ্গ ও মিম এখন তরুণদের রাজনৈতিক ভাষার অংশ হয়ে উঠেছে।

শু/সবা