দেশের বাজারে শুঁটকির চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। সেই চাহিদার জোগান দিতে চট্টগ্রামের শুঁটকি পল্লীগুলোতে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন শ্রমিকরা। শুঁটকি উৎপাদনের ভরা মৌসুমে মাচান থেকে শুরু করে বাঁশে ঝুলিয়ে মাছ শুকানোর কাজে যেন দম ফেলার ফুরসত নেই। তবে ব্যস্ততার আড়ালে রয়েছে উৎপাদনকারীদের দীর্ঘদিনের দুশ্চিন্তা—নির্দিষ্ট জমি ও সরকারি নজরদারির অভাব।
জানা যায়, শুঁটকি উৎপাদনের মৌসুম সাধারণত আগস্ট থেকে শুরু হয়ে এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত চলে। শুষ্ক মৌসুম হওয়ায় এ সময়টাকেই সবচেয়ে উপযোগী ধরা হয়। চট্টগ্রামের ইছানগর, চরপাথরঘাটা ও উত্তর বাকলিয়ার ক্ষেতে চর—এই তিনটি বৃহৎ শুঁটকি পল্লীতে বর্তমানে উৎপাদন তুঙ্গে। কর্ণফুলী নদীর তীরবর্তী হওয়ায় এসব এলাকায় মাছ পরিবহন ও বাজারজাতকরণ তুলনামূলক সহজ।
সরেজমিনে দেখা যায়, বাঁশের মাচানে বসে নারী শ্রমিকরা শুঁটকি শুকানোর কাজে ব্যস্ত। পুরুষ শ্রমিকরা উঁচু বাঁশে দাঁড়িয়ে ছুরি, লাক্কা, লইট্টাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ঝুলিয়ে দিচ্ছেন। অন্যদিকে, একদল নারী কাঁচা মাছ পরিষ্কার করে লবণ মিশিয়ে শুকানোর জন্য প্রস্তুত করছেন।
শুঁটকি শ্রমিক আলী হোসেন বলেন, “সব প্রক্রিয়া শেষ করে বিক্রির উপযোগী করতে তিন থেকে চার সপ্তাহ সময় লাগে। এখন মৌসুম হওয়ায় গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করতে হচ্ছে।”
তবে উৎপাদনকারীরা বলছেন, সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো নির্দিষ্ট জমির অভাব। চট্টগ্রাম ক্ষুদ্র শুঁটকি উৎপাদন-বিপণন সমবায় সমিতির সহ-সভাপতি মোহাম্মদ মুসা সওদাগর জানান, “২৫ বছর ধরে এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। কিন্তু শুঁটকি উৎপাদনের জন্য আমাদের কোনো স্থায়ী জায়গা নেই। বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে বাৎসরিক চুক্তিতে জমি নিতে হয়। সরকার যদি দীর্ঘমেয়াদি ইজারা দিত, তাহলে নিশ্চিন্তে ব্যবসা করা যেত।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, আড়তদারদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার কারণে উৎপাদনকারীরা ন্যায্য মূল্য পান না। অনেক সময় বাকি রেখে শুঁটকি নিয়ে যাওয়া হয়, ফলে কম মুনাফায় কোনোমতে টিকে থাকতে হচ্ছে।
অন্যদিকে, আড়তদাররা বলছেন, এটিই ব্যবসার নিয়ম। আছদগঞ্জের শুঁটকি ব্যবসায়ী ইসমাইল হোসেন বলেন, “চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দামও বেড়েছে। গত দুই বছরে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে দাম। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা আগের মতো শুঁটকি কিনতে পারছেন না।”
বর্তমানে আছদগঞ্জ বাজারে লইট্টা শুঁটকি প্রতি কেজি ৫০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা, ছুরি শুঁটকি ৩০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকা, চিংড়ি শুঁটকি ৩০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা এবং রূপচান্দা শুঁটকি ১ হাজার ৮০০ থেকে ৫ হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
চট্টগ্রাম শুঁটকি ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ওসমান হায়দার জানান, দেশের মোট চাহিদার মাত্র ৪০ শতাংশ স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত শুঁটকি দিয়ে মেটানো হয়। বাকি ৬০ শতাংশ আমদানি করতে হয় ভারত, মিয়ানমার ও পাকিস্তান থেকে। আমদানিতে উচ্চ শুল্ক ও অতিরিক্ত করের কারণে দাম আরও বাড়ছে।
উৎপাদনকারী ও ব্যবসায়ীদের দাবি, শুঁটকি শিল্প টিকিয়ে রাখতে হলে নির্দিষ্ট উৎপাদন এলাকা নির্ধারণ, সহজ শর্তে ইজারা এবং শুল্ক কাঠামো পুনর্বিবেচনা জরুরি। নইলে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প ভবিষ্যতে আরও সংকটে পড়বে।
শু/সবা






















