পৃথিবীর মানচিত্রে এক বিশাল সাদা শূন্যতা—বরফে ঢাকা, নীরব, নির্মম অথচ অপার সৌন্দর্যে ভরা। সেই মহাদেশের নাম অ্যান্টার্কটিকা। বহু অভিযাত্রীর স্বপ্নের গন্তব্য, প্রকৃতির শেষ অমলিন অধ্যায়। পৃথিবীর সবচেয়ে শীতল ও প্রতিকূল মহাদেশ অ্যান্টার্কটিকা এবার সাক্ষী হলো বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় কনটেন্ট নির্মাতা সালাহউদ্দিন সুমনের পদচারণার।
সহযাত্রী নিলয় কুমার বিশ্বাসকে সঙ্গে নিয়ে সালাউদ্দিন সুমন সফলভাবে পা রেখেছেন এই বরফাচ্ছন্ন ভূমিতে, যা বাংলাদেশি ভ্রমণ কনটেন্ট নির্মাণে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এটি শুধু একটি ভ্রমণ নয়; এটি এক প্রজন্মের সাহস, কল্পনা ও গল্প বলার নতুন দিগন্ত উন্মোচনের কাহিনি।
দক্ষিণের শেষ শহর থেকে যাত্রা
তাদের অভিযাত্রার সূচনা হয়েছিল আর্জেন্টিনার ছোট্ট কিন্তু কিংবদন্তিতুল্য শহর উশুয়াইয়া থেকে—যাকে বলা হয় পৃথিবীর দক্ষিণতম শহর। সেখানকার ঠান্ডা বাতাসে, সমুদ্রের ধারে দাঁড়িয়ে হয়তো তারা বুঝেছিলেন, সামনে অপেক্ষা করছে এক অন্য জগৎ।
জাহাজ ধীরে ধীরে দক্ষিণ মহাসাগরের উত্তাল ঢেউ পেরিয়ে এগোতে থাকে। চারপাশে কেবল নীল জল আর ধূসর আকাশ। সেই অভিযানের আয়োজন করেছিল নেদারল্যান্ডসভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ওশেনওয়াইড এক্সপেডিশনস—যারা দীর্ঘদিন ধরে মেরু অঞ্চলে গবেষণা ও ভ্রমণ আয়োজন করে আসছে।
দিনের পর দিন সমুদ্রযাত্রার পর একসময় দিগন্তে ভেসে ওঠে বরফের দেয়াল। যেন পৃথিবীর শেষ প্রহরী দাঁড়িয়ে আছে।
বরফের রাজ্যে প্রথম পদচারণা
জাহাজ যখন অ্যান্টার্কটিকার উপকূলে নোঙর ফেলে, তখন চারপাশে কেবল সাদা আর নীলের মেলবন্ধন। অ্যান্টার্কটিক উপদ্বীপের দ্বীপপুঞ্জ আর মূল ভূখণ্ডের কিছু অংশ ঘুরে দেখেন তারা। সুউচ্চ হিমবাহ, পাহাড়ের গায়ে জমে থাকা হাজার বছরের বরফ, আর নীরবতার গভীরতা—সব মিলিয়ে যেন এক অবাস্তব দৃশ্যপট।
সুমনের ক্যামেরা বন্দি করে প্রতিটি মুহূর্ত। বরফের ওপর পায়ের শব্দ, দূরে পেঙ্গুইনের সারি, আর হিমেল বাতাসের ঝাপটা—সবকিছুই হয়ে ওঠে এক জীবন্ত গল্প।
এই মহাদেশকে বলা হয় পৃথিবীর শেষ মহান বন্যভূমি। এখানে মানুষের উপস্থিতি ক্ষণিকের, প্রকৃতির অস্তিত্ব চিরন্তন। সুমন পরে বলেছিলেন, পৃথিবীর সবচেয়ে শীতল মহাদেশে দাঁড়িয়ে তিনি যেন নিজের স্বপ্নের গভীরে পৌঁছে গিয়েছিলেন।
পথে পথে বিচ্ছিন্ন দ্বীপের বিস্ময়
অ্যান্টার্কটিকায় পৌঁছানোর আগেই তাদের যাত্রা ছিল রোমাঞ্চে ভরা। তারা ঘুরে দেখেন ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ—দক্ষিণ আটলান্টিকের এক বিচ্ছিন্ন ভূখণ্ড, যেখানে প্রকৃতি এখনো অক্ষত।
এরপর তারা যান দক্ষিণ জর্জিয়া দ্বীপে—ব্রিটেন থেকে বহু দূরে, কিন্তু আর্জেন্টিনার কাছাকাছি অবস্থিত এক ব্রিটিশ ওভারসিজ টেরিটরি।
এই দ্বীপগুলো যেন জীবন্ত প্রাকৃতিক জাদুঘর। হাজার হাজার পেঙ্গুইনের কলোনি, সিলের দল, বিরল সামুদ্রিক পাখি—প্রতিটি দৃশ্যই অবিশ্বাস্য। মানুষের কোলাহল নেই, নেই আধুনিক সভ্যতার চিহ্ন। কেবল প্রকৃতি তার নিজস্ব ছন্দে বেঁচে আছে।
নিলয়, মাত্র ২৭ বছর বয়সে, এমন অভিজ্ঞতার অংশ হতে পেরে আপ্লুত। তার ভাষায়, যেকোনো ভ্রমণকারীর জন্য অ্যান্টার্কটিকা চূড়ান্ত গন্তব্য। জীবনের এই বয়সে এমন অভিযানে অংশ নেওয়া তার কাছে এক অসাধারণ অর্জন।
স্বপ্নের পেছনে শক্তিশালী সহযাত্রা
এই অভিযাত্রা ছিল ব্যয়বহুল ও চ্যালেঞ্জিং। অ্যান্টার্কটিকায় ভ্রমণ পৃথিবীর অন্যতম ব্যয়বহুল অভিযানের মধ্যে পড়ে। তবু স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে এগিয়ে এসেছে কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান।
আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন তার্কিশ এয়ারলাইন্স যুক্ত হয়েছে টাইটেল স্পন্সর হিসেবে। পাশাপাশি বাংলাদেশের শীর্ষ ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ডট ইন্টারনেট এই অভিযানের লিড স্পন্সর হিসেবে সহায়তা করেছে।
এই সমর্থন শুধু আর্থিক নয়; এটি এক ধরনের আস্থা—বাংলাদেশি কনটেন্ট নির্মাতারা বিশ্বমঞ্চে নিজেদের গল্প বলার সক্ষমতা রাখেন।
বাংলায় অ্যান্টার্কটিকার গল্প
সালাউদ্দিন সুমনের বিশেষত্ব হলো—তিনি ভ্রমণকে কেবল ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় সীমাবদ্ধ রাখেন না। তিনি গল্প বলেন, দেখান, ব্যাখ্যা করেন। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। দক্ষিণ গোলার্ধ থেকে ধারণ করা ভিডিও ও অভিজ্ঞতা তিনি শেয়ার করবেন তার ফেসবুক ও ইউটিউব চ্যানেলে, বাংলাভাষী দর্শকদের জন্য।
পৃথিবীর শেষ সীমান্তের গল্প, বাংলায়—এ যেন এক নতুন দিগন্ত।
অ্যান্টার্কটিকার বরফ, পেঙ্গুইনের সারি, নীল হিমবাহ—সবকিছু যখন মাতৃভাষায় বর্ণিত হয়, তখন তা হয়ে ওঠে আরও কাছের, আরও আপন।
ব্যক্তিগত স্বপ্ন থাকে জাতীয় অনুপ্রেরণা
এই যাত্রা শুধু দুই তরুণের ব্যক্তিগত স্বপ্নপূরণ নয়। এটি বাংলাদেশের ভ্রমণ কনটেন্ট নির্মাণে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
বাংলাদেশ থেকে খুব কম মানুষই অ্যান্টার্কটিকায় পৌঁছেছেন, তারও কম কেউ এই অভিজ্ঞতাকে বাংলায় নথিবদ্ধ করেছেন। সেই শূন্যতা পূরণে এগিয়ে এসেছেন সুমন ও নিলয়।
বরফের দেশে দাঁড়িয়ে হয়তো তারা উপলব্ধি করেছেন—মানুষের স্বপ্নের কোনো ভৌগোলিক সীমা নেই। সাহস থাকলে, পরিকল্পনা থাকলে, আর গল্প বলার ইচ্ছা থাকলে—পৃথিবীর শেষ প্রান্তও নাগালের বাইরে থাকে না।
বাংলাদেশি দর্শকদের জন্য অ্যান্টার্কটিকা
সুমন পুরো অভিযানের অভিজ্ঞতা ভিডিও আকারে ধারণ করছেন এবং তার ফেসবুক ও ইউটিউব চ্যানেলে দক্ষিণ গোলার্ধ থেকে সরাসরি অভিজ্ঞতা শেয়ার করছেন। এর মাধ্যমে বাংলাদেশি দর্শকরা নিজেদের ভাষায় অ্যান্টার্কটিকার মতো দুর্লভ গন্তব্য ঘুরে দেখার সুযোগ পাচ্ছেন।
বরফাচ্ছন্ন এই মহাদেশে পা রাখার পর নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে সুমন বলেন,
“পৃথিবীর সবচেয়ে শীতল মহাদেশ ঘুরে দেখার স্বপ্ন সবসময়ই আমার ছিল। আমি সত্যিই আনন্দিত যে, আমার ভাষায় এই অসাধারণ স্থানটি আমার দর্শকদের সামনে তুলে ধরতে পারছি—যা আগে বাংলাদেশ থেকে কেউ করেনি।”
নিলয় কুমার বিশ্বাসও তাঁর উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে একে যেকোনো ভ্রমণপ্রেমীর জন্য চূড়ান্ত গন্তব্য বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন,
“এই অভিযানের অংশ হতে পেরে আমি সত্যিই ভীষণ আনন্দিত। যে কোনো ভ্রমণকারীর জন্য অ্যান্টার্কটিকা অবশ্যই চূড়ান্ত গন্তব্য হওয়া উচিত। মাত্র ২৭ বছর বয়সে এটি করতে পারা আমার জীবনের এক অসাধারণ মুহূর্ত।”
শেষ সীমান্তের আহ্বান
অ্যান্টার্কটিকা কঠিন, ব্যয়বহুল, ঝুঁকিপূর্ণ। তবু এর আকর্ষণ অদম্য। কারণ সেখানে আছে প্রকৃতির নির্মলতা, মানবসভ্যতার স্পর্শহীন এক বিশালতা।
সালাহউদ্দিন সুমন ও নিলয় কুমার বিশ্বাস সেই নির্মলতার সাক্ষী হয়ে ফিরছেন। তারা শুধু ছবি বা ভিডিও নিয়ে ফিরছেন না; নিয়ে ফিরছেন এক অনুপ্রেরণা—বাংলাদেশি তরুণদের জন্য, স্বপ্নদেখাদের জন্য, গল্পকারদের জন্য।
পৃথিবীর সাদা মহাদেশে তাদের পদচিহ্ন হয়তো বরফে মিলিয়ে যাবে। কিন্তু তাদের এই অভিযাত্রার গল্প রয়ে যাবে—বাংলাদেশের ভ্রমণ ইতিহাসে এক উজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে।
শু/সবা




















