9:33 pm, Monday, 18 May 2026

পবিপ্রবি ভিসির বিদায় ঘণ্টা: শেষ মুহূর্তে ১০৪ জনকে অবৈধ নিয়োগের তোড়জোড় 

​পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (পবিপ্রবি) শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার পর এবার উপাচার্য অধ্যাপক ড. কাজী রফিকুল ইসলামের বিদায় ঘণ্টা বাজতে শুরু করেছে বলে গুঞ্জন উঠেছে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে পদ হারানোর আগেই আখের গুছিয়ে নিতে অবৈধভাবে ১০৪ জনকে এডহক নিয়োগ দিয়ে তিনি ক্যাম্পাস ছাড়ার পাঁয়তারা করছেন বলেও জানা গেছে।
​গত সোমবার (১১ মে) উপাচার্যবিরোধী মানববন্ধনে শিক্ষক ও সাংবাদিকদের ওপর বহিরাগত সন্ত্রাসীদের অতর্কিত হামলার পর থেকেই উত্তাল পবিপ্রবি ক্যাম্পাস। প্রথম থেকেই এই হামলার নেপথ্যে উপাচার্যের ইন্ধন রয়েছে বলে অভিযোগ করে আসছিলেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। এবার সেই অভিযোগের পালে আরও হাওয়া লেগেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, হামলার আগের দিনই হামলাকারীদের সঙ্গে গোপন বৈঠক করেছেন উপাচার্য কাজী রফিকুল ইসলাম। এমন একটি ভিডিও ফুটেজ ইতোমধ্যে গণমাধ্যমকর্মীদের হাতে এসেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তুলেছে।
​ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করতে উপাচার্যের বেপরোয়া দুর্নীতির আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। জানা গেছে, শিক্ষকদের ওপর ওই হামলার মাত্র কিছুদিন পূর্বেই উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্প পরিচালকের (পিডি) নিকট থেকে ২৫ লাখ টাকা দাবি করেছিলেন। এছাড়া একাধিক সূত্রে জানা গেছে, নিজের পদটি সুরক্ষিত রাখতে স্থানীয় সংসদ সদস্য আলতাফ হোসেন চৌধুরীর নির্বাচনী প্রচারণায় বিপুল অঙ্কের টাকা ব্যয় করেছেন উপাচার্য। উদ্দেশ্য ছিল, নির্বাচনে তিনি জয়ী হলে তার প্রভাব খাটিয়ে নিজের ভিসি পদটি টিকিয়ে রাখা। এছাড়া নিজের আধিপত্য বজায় রাখতে ও যেকোনো পরিস্থিতিতে স্থানীয় প্রভাবশালীদের পাশে পেতে রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে নিজস্ব বলয় তৈরি করেছিলেন তিনি।
তবে ক্যাম্পাসে চলমান তীব্র আন্দোলন ও দেশজুড়ে সমালোচনার মুখে কাজী রফিকুল ইসলামকে আর উপাচার্য পদে রাখা হচ্ছে না—এমন খবর ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়েছে। আর এই সুযোগেই নিজের শেষ আখের গুছিয়ে নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন তিনি। বিদায়ের ঠিক আগমুহূর্তে, স্থানীয় রাজনীতিকদের দেওয়া পূর্বপ্রতিশ্রুতি রক্ষা ও ব্যক্তিগত আর্থিক ফায়দা লুটতে সম্পূর্ণ অবৈধ প্রক্রিয়ায় ১০৪ জনকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ার নীল নকশা এঁকেছেন তিনি। চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, এই ১০৪ জনের নিয়োগের তালিকায় শিক্ষকদের ওপর হামলার ঘটনায় দায়ের করা মামলার ২ নম্বর আসামি বশির উদ্দিনের ছেলের নামও রয়েছে বলে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে।
​এদিকে, হামলাকারীদের বিচার ও উপাচার্যকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে ক্যাম্পাসে টানা ‘শাটডাউন’ কর্মসূচি চলছে। আন্দোলনরত শিক্ষকরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, যার হাতে শিক্ষকদের রক্ত লেগে আছে, তাকে আর একদিনের জন্যও ক্যাম্পাসে বরদাশত করা হবে না। এই ন্যাক্কারজনক হামলার পর উপাচার্য ড. কাজী রফিকুল ইসলাম ক্যাম্পাসে থাকার নৈতিক অবস্থান পুরোপুরি হারিয়েছেন।
​পাশাপাশি, ডিন কাউন্সিলের মত উপেক্ষা করে ডিভিএম ও অ্যানিমেল হাজবেন্ড্রি ডিগ্রি বাতিল করে ‘কম্বাইন্ড ডিগ্রি’ চালুর হঠকারী সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরাও উপাচার্যের অপসারণ দাবিতে অনড়। সাধারণ শিক্ষার্থীদের পক্ষে খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞান অনুষদের শিক্ষার্থী নাহিদ জানান, বাইরের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসা পদলোভী এই উপাচার্য নিজের স্বার্থে বহিরাগতদের দিয়ে ক্যাম্পাসের পরিবেশ নষ্ট করেছেন। আমাদের ক্যাম্পাসের প্রতি তার কোনো আন্তরিকতা নেই। অবিলম্বে তার পদত্যাগ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগ্য শিক্ষকদের মধ্য থেকে নতুন উপাচার্য নিয়োগের দাবি জানান তিনি।
​এসব অভিযোগ ও হামলার বিষয়ে এর আগে উপাচার্য অধ্যাপক ড. কাজী রফিকুল ইসলাম ঢাকায় অবস্থানের কথা জানিয়ে বলেছিলেন, “হামলার ঘটনাটি অনাকাঙ্ক্ষিত। ক্যাম্পাসে ফিরে তদন্তসাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” তবে নতুন করে ওঠা রাজনৈতিক অর্থায়ন, চাঁদাবাজি, গোপন বৈঠক ও ১০৪ জন অবৈধ নিয়োগের গুঞ্জনের বিষয়ে তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
​বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ শিক্ষকরা বলছেন, ইতিপূর্বেও বহিরাগত উপাচার্যদের দ্বারা পবিপ্রবির উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হওয়া এবং মেয়াদ শেষে তাদের আখের গুছিয়ে চলে যাওয়ার তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাই এবার বিদায়লগ্নে অবৈধ নিয়োগের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়কে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ও প্রশাসনিক সংকটে ফেলার এই অপচেষ্টা যেকোনো মূল্যে রুখে দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
শু/সবা
Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

five × four =

About Author Information

সৌদি আরবে ৮ হাজার সেনা ও যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেছে পাকিস্তান

পবিপ্রবি ভিসির বিদায় ঘণ্টা: শেষ মুহূর্তে ১০৪ জনকে অবৈধ নিয়োগের তোড়জোড় 

Update Time : ০৮:৪১:৩৪ pm, Monday, ১৮ মে ২০২৬
​পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (পবিপ্রবি) শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার পর এবার উপাচার্য অধ্যাপক ড. কাজী রফিকুল ইসলামের বিদায় ঘণ্টা বাজতে শুরু করেছে বলে গুঞ্জন উঠেছে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে পদ হারানোর আগেই আখের গুছিয়ে নিতে অবৈধভাবে ১০৪ জনকে এডহক নিয়োগ দিয়ে তিনি ক্যাম্পাস ছাড়ার পাঁয়তারা করছেন বলেও জানা গেছে।
​গত সোমবার (১১ মে) উপাচার্যবিরোধী মানববন্ধনে শিক্ষক ও সাংবাদিকদের ওপর বহিরাগত সন্ত্রাসীদের অতর্কিত হামলার পর থেকেই উত্তাল পবিপ্রবি ক্যাম্পাস। প্রথম থেকেই এই হামলার নেপথ্যে উপাচার্যের ইন্ধন রয়েছে বলে অভিযোগ করে আসছিলেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। এবার সেই অভিযোগের পালে আরও হাওয়া লেগেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, হামলার আগের দিনই হামলাকারীদের সঙ্গে গোপন বৈঠক করেছেন উপাচার্য কাজী রফিকুল ইসলাম। এমন একটি ভিডিও ফুটেজ ইতোমধ্যে গণমাধ্যমকর্মীদের হাতে এসেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তুলেছে।
​ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করতে উপাচার্যের বেপরোয়া দুর্নীতির আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। জানা গেছে, শিক্ষকদের ওপর ওই হামলার মাত্র কিছুদিন পূর্বেই উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্প পরিচালকের (পিডি) নিকট থেকে ২৫ লাখ টাকা দাবি করেছিলেন। এছাড়া একাধিক সূত্রে জানা গেছে, নিজের পদটি সুরক্ষিত রাখতে স্থানীয় সংসদ সদস্য আলতাফ হোসেন চৌধুরীর নির্বাচনী প্রচারণায় বিপুল অঙ্কের টাকা ব্যয় করেছেন উপাচার্য। উদ্দেশ্য ছিল, নির্বাচনে তিনি জয়ী হলে তার প্রভাব খাটিয়ে নিজের ভিসি পদটি টিকিয়ে রাখা। এছাড়া নিজের আধিপত্য বজায় রাখতে ও যেকোনো পরিস্থিতিতে স্থানীয় প্রভাবশালীদের পাশে পেতে রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে নিজস্ব বলয় তৈরি করেছিলেন তিনি।
তবে ক্যাম্পাসে চলমান তীব্র আন্দোলন ও দেশজুড়ে সমালোচনার মুখে কাজী রফিকুল ইসলামকে আর উপাচার্য পদে রাখা হচ্ছে না—এমন খবর ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়েছে। আর এই সুযোগেই নিজের শেষ আখের গুছিয়ে নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন তিনি। বিদায়ের ঠিক আগমুহূর্তে, স্থানীয় রাজনীতিকদের দেওয়া পূর্বপ্রতিশ্রুতি রক্ষা ও ব্যক্তিগত আর্থিক ফায়দা লুটতে সম্পূর্ণ অবৈধ প্রক্রিয়ায় ১০৪ জনকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ার নীল নকশা এঁকেছেন তিনি। চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, এই ১০৪ জনের নিয়োগের তালিকায় শিক্ষকদের ওপর হামলার ঘটনায় দায়ের করা মামলার ২ নম্বর আসামি বশির উদ্দিনের ছেলের নামও রয়েছে বলে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে।
​এদিকে, হামলাকারীদের বিচার ও উপাচার্যকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে ক্যাম্পাসে টানা ‘শাটডাউন’ কর্মসূচি চলছে। আন্দোলনরত শিক্ষকরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, যার হাতে শিক্ষকদের রক্ত লেগে আছে, তাকে আর একদিনের জন্যও ক্যাম্পাসে বরদাশত করা হবে না। এই ন্যাক্কারজনক হামলার পর উপাচার্য ড. কাজী রফিকুল ইসলাম ক্যাম্পাসে থাকার নৈতিক অবস্থান পুরোপুরি হারিয়েছেন।
​পাশাপাশি, ডিন কাউন্সিলের মত উপেক্ষা করে ডিভিএম ও অ্যানিমেল হাজবেন্ড্রি ডিগ্রি বাতিল করে ‘কম্বাইন্ড ডিগ্রি’ চালুর হঠকারী সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরাও উপাচার্যের অপসারণ দাবিতে অনড়। সাধারণ শিক্ষার্থীদের পক্ষে খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞান অনুষদের শিক্ষার্থী নাহিদ জানান, বাইরের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসা পদলোভী এই উপাচার্য নিজের স্বার্থে বহিরাগতদের দিয়ে ক্যাম্পাসের পরিবেশ নষ্ট করেছেন। আমাদের ক্যাম্পাসের প্রতি তার কোনো আন্তরিকতা নেই। অবিলম্বে তার পদত্যাগ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগ্য শিক্ষকদের মধ্য থেকে নতুন উপাচার্য নিয়োগের দাবি জানান তিনি।
​এসব অভিযোগ ও হামলার বিষয়ে এর আগে উপাচার্য অধ্যাপক ড. কাজী রফিকুল ইসলাম ঢাকায় অবস্থানের কথা জানিয়ে বলেছিলেন, “হামলার ঘটনাটি অনাকাঙ্ক্ষিত। ক্যাম্পাসে ফিরে তদন্তসাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” তবে নতুন করে ওঠা রাজনৈতিক অর্থায়ন, চাঁদাবাজি, গোপন বৈঠক ও ১০৪ জন অবৈধ নিয়োগের গুঞ্জনের বিষয়ে তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
​বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ শিক্ষকরা বলছেন, ইতিপূর্বেও বহিরাগত উপাচার্যদের দ্বারা পবিপ্রবির উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হওয়া এবং মেয়াদ শেষে তাদের আখের গুছিয়ে চলে যাওয়ার তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাই এবার বিদায়লগ্নে অবৈধ নিয়োগের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়কে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ও প্রশাসনিক সংকটে ফেলার এই অপচেষ্টা যেকোনো মূল্যে রুখে দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
শু/সবা