একজন সফল কৃষক হিসেবে উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন সুলতানুর রহমান মুলতান। তিনি উপজেলার নৈহাটী ইউনিয়নের জাবুসা দক্ষিণপাড়া এলাকার মৃত মোকলেছুর রহমানের ছেলে। কৃষক সুলতান ৮ম শ্রেণী পাশ হলেও সন্তানদের উচ্চ শিক্ষার স্বপ্ন দেখেন তিনি। দুই সন্তানের মধ্যে ছেলে আল লোমান ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে লেখাপড়া করে। আর মেয়ে জান্নাতুল মাওয়া সিনথিয়া রূপসা কলেজে ডিগ্রী দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত। পাশাপাশি কৃষিতে তার সফলতায় সহযোগিতা করেন সহধর্মিণী হিরা বেগম এবং দু’ সন্তান। তিনি ২০১২ সাল থেকে সকল প্রতিকূলতাকে হার মানিয়ে কৃষি চাষে স্বাবলম্বী হয়েছেন। তিনি কখনও থেমে ছিলেন না। তৃণমূল পর্যায় থেকে উঠে আসা এ সফল কৃষক সুলতান দৃষ্টান্ত স্থাপন করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন।

সুলতানের সফলতার গল্প : ১৯৯২ সালে প্রথম জুতার ব্যবসা করে শুরু করেন সুলতান। ২০০৫ সালে রামপালের ফয়লারহাট বাজারে বাগদা ও গলদা চিংড়ির রেনু পোনার ব্যবসা করেন। পরবর্তীতে স্বল্প পরিসরে গরু পালন করেন। ২০১০ সালে শুরু হয় তার কৃষি ও মৎস্য ঘেরের চাষ। এভাবেই কঠোর পরিশ্রম করে ব্যর্থতাকে হার মানিয়ে শুরু হয় তার জীবন-সংগ্রাম।
এভাবেই তিনি শুরু করেন ধান বীজ উৎপাদন, কেঁচো সার উৎপাদন, গরু-ছাগলের খামার, মাছের ঘের, হাঁস, মুরগী, কবুতরসহ নানা বিষয়ে তিনি সফলতা অর্জন করেছেন। এলাকার অন্যান্য কৃষকরা তার এই সাফল্য দেখে উৎসাহী হয়ে কৃষিতে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। দিন যতই যাচ্ছে, ততই পরিশ্রম করে সফলতার পানে এগিয়ে যাচ্ছেন তিনি। অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে তিনি রূপসা কৃষি ব্যাংক থেকে ৪ লাখ টাকা লোন নিয়ে কৃষি কাজে ব্যয় করেছেন। তার কৃষিতে মাসিক বেতনে ৫ জন শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে।
উপজেলা কৃষি অফিসের সার্বিক তত্বাবধানে কৃষক সুলতানুর রহমান আরও উৎসাহ-উদ্দীপনা ও সহযোগীতা পেয়েছেন। তার কৃষিতে সবমিলিয়ে বছরে আয়ের পরিমান প্রায় ১০ লাখ টাকা। এর মধ্যে বীজ ধান উৎপাদনে ৫ লাখ, গরু পালনে ৩ লাখ ও মাছ চাষে ২ লাখ টাকা। এভাবেই তিনি স্বাবলম্বী হতে শুরু করেন। বর্তমানে তিনি একজন সফল কৃষক। কৃষি অফিসার ও প্রাণিসম্পদ অফিস থেকে সহযোগিতা পেয়েছেন এ কৃষক।
সুলতানুর রহমান জানান, কৃষিতে সফলতা অর্জনের কারণে বিভিন্ন দপ্তর থেকে সনদপত্র পেয়েছেন সুলতান। বর্তমানে বোরো মৌসুমে চাষাবাদ ধান উপশী জাত-‘৯৯’ ও উপশী জাত বিনা-২৫ ধান রোপণ করছেন।
রূপসার জাবুসা বিলে কাটা ধানের ঝরে পড়া বীজ থেকে সম্প্রতি ‘৯৯’ ধান জাত বাংলাদেশে প্রথম উৎপাদন করেছেন তিনি। ২০২১ সালে আলোচিত বঙ্গবন্ধু ধান ১০০, রোপণ করেও তাক লাগিয়েছিলেন এই কৃষক সুলতানুর রহমান।
আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে কৃষিতে আরো ভালো কিছু করতে হলে জলবায়ু পরিবর্তন সহনশীল জাত যেমন ধান, পাট, গম, আলু, শাকসবজি ইত্যাদি ও আধুনিক প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি ব্যবহার হলে আগামীতে কৃষি ক্ষেত্রে আরো বেশি লাভবান হবে বলে এ সফল কৃষক আশাবাদী।
কৃষক সুলতানুর রহমান বলেন, সফলতা পেতে হলে তার পিছনে কঠোর পরিশ্রম এবং সময়ের বিকল্প নেই। নিজের চেষ্টায় এবং রূপসা উপজেলা কৃষি অফিসের সহযোগিতায় আজ আমি সফলতা অর্জন করেছি। আমার এই সফলতা দেখে অনেক কৃষক আমার কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে তারাও লাভবান হচ্ছে এবং তারা সামনের দিকে অগ্রসরও হচ্ছে।

রূপসা উপজেলা উপ-সহকারী কৃষি অফিসার হিমাদ্রী বিশ্বাস বলেন, নৈহাটীর বাগমারা ব্লকের জাবুসা গ্রামের সুলতানুর রহমান আমাদের গর্ব এবং একজন আদর্শ কৃষক। বিগত ৪ বছর ধরে আমরা তাকে মোটিভেশান ও উদ্বুদ্ধ করে কৃষি কাজের আওতায় নিয়ে আসি। তাকে একটি বীজ উৎপাদন প্রদর্শনী-এসএমই’র সুযোগ দেয়া হয়। এসএমই বীজ উৎপাদন হিসেবে আমরা ঢাকায় পাঠাই। বীজ উৎপাদন করতে তিনি আগ্রহ প্রকাশ করেন। আমরা অফিস থেকে ট্রেনিং দিই। এরপর বীজ, সার এবং যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা তাকে দেওয়া হয়। এটা যদি প্রতিটি ব্লকে আমরা একজন করে বীজ উদ্যোক্তা করতে পারি তাহলে বিএডিসিতে যে বীজের সংকট হয়, আশা করি সে বীজের সংকট আর থাকবে না।
রূপসা উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, সরকার কৃষিখাতে ব্যাপক উন্নয়ন করে যাচ্ছে। তারই ধারাবাহিকতায় রূপসার জাবুসা গ্রামের কৃষক সুলতানুর রহমান আমাদের উপজেলার কৃষি অফিস থেকে উন্নতমানের বীজ সংরক্ষণের প্রকল্পের আওতায় ফার্মার ফিল্ড স্কুল (এফএফএস) মাঠ স্কেলের কৃষক দলনেতা হিসেবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত আমাদের একজন সফল কৃষক।
আমরা প্রকল্প থেকে আমাদের অফিসের সহযোগিতায় তাকে বীজ উৎপাদনকারী এবং বাজারজাতকারী হিসেবে কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে লাইসেন্স করে দিয়েছি। তিনি যেন ক্ষুদ্র পরিসর থেকে বৃহত্তর পরিসরে কোয়ালিটি সম্পন্ন উন্নতমানের বীজ উৎপাদন ও বিপনন করে সফল কৃষক উদ্যোক্তা হয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেন সেই সাফল্য কামনা করি।


























