০৭:২৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৮ জানুয়ারী ২০২৬, ২৫ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সাব রেজিস্ট্রি অফিসের নৈশ প্রহরীর কোটি কোটি টাকার সম্পদ

জামালপুরের মাদারগঞ্জ সাব রেজিস্ট্রি অফিসে মাস্টার রোলে নৈশ প্রহরী পদে চাকরী করেন জাহাঙ্গীর আলম। বেতন ১৭শ টাকা। অথচ আজ কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের মালিক।

জানা যায়, মাদারগঞ্জ উপজেলা কমপ্লেক্সের কাছে কোটি টাকার জমিতে কয়েক কোটি টাকায়  তৈরী করেছেন রাজ প্রাসাদ, গরুর খামার, আবাদী জমি, নিজের থাকার রাজকীয় বাড়ি, একাধিক বাসা বাড়ি, আবাদী জমি, পুকুর কোন কিছুর অভাব নেই। রয়েছে সরকারী খাস জমি দখল করে গরুর খামারসহ একাধিক পাকা বাড়ির অভিযোগও। সবকিছু হয়েছে মাদারগঞ্জ সাব রেজিষ্ট্রি অফিসের বদৌলতে। কয়েক বছর আগে দিন মজুরের কাজ করেছেন এই জাহাঙ্গীর। এখন কোটি কোটি টাকার মালিক বনে গেছে।

সরেজমিনে জানা যায়, ১২ বছর আগে সাব রেজিস্ট্রি অফিসের কর্মকর্তাদের খাবার রান্নার কাজ করতে গিয়ে সে মাস্টার রোলে চাকরী পেয়ে যান। এখানেই তার ভাগ্য খুলে যায়। রাতারাতি সে অফিসের গোপন কাজের সাথে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন। রাতের অফিসে গোপন কাজগুলো তার হুকুমেই চলে। যতো অনৈতিক অবৈধ কাজ হয় সবটার ভাগ যায় তার হাতে। জমি রেজিস্ট্রি, দলিল রেজিস্ট্রির কমিশন, নকল উত্তোলনসহ সব অবৈধ কাজ তার হাত ছাড়া হয় না। এক কথায় তিনি ২য় সাব রেজিস্ট্রার বলে জানে অফিসের লোকজন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন দলিল লেখক ও অফিসের কর্মচারী জানান, এ অফিসে জাহাঙ্গীরের একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। তার সুপারিশে আরো কয়েকজন হোমড়া চোমড়া ছেলেদের নকল নবিশের চাকরী দিয়ে তার হাত শক্তিশালী করেছেন। কেউ প্রতিবাদ করলে তারা হুমকি দেয় এমনকি মারার ভয় দেখিয়ে মুখ বন্ধ করে রাখে। তার সিন্ডিকেটের কয়েকজনের কাছে পুরো সাব রেজিস্ট্রি কার্যালয় জিম্মি হয়ে পড়েছে।

এলাকাবাসীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, জাহাঙ্গীর আলমের বাড়ি উপজেলার সুখনগরী গ্রামে। নদী ভাঙ্গনের পর সে উপজেলা শহরের পাল পাড়ায় আশ্রয় নেয়। এক সময় দিনমজুরী কামলা খাটতো, পরে কয়েজনের বাড়িতে বছর বান্দা কামলা হিসেবে কাজ শুরু করে জাহাঙ্গীর। এক সময় কাজ রেখে উপজেলার বিভিন্ন অফিসে ছোট খাট হাত ফরমায়েসী কাজ করতেন। পরে তার স্থিতি হয় উপজেলা সাব রেজেষ্ট্রি অফিসে। সেখানে  অফিসারদের রান্না ও ঘর মুছার কাজ করতেন। কাজ শুরু করার পর তৎকালীন এক সাব রেজিষ্ট্রার তাকে দিয়ে অফিসের ছোট খাটো কাজ করানো শুরু করে। এক সময় সে মাস্টার রোলে ওই অফিসের  নৈশপ্রহরীর কাজ পায় ৩শ টাকার বেতনে। বর্তমানে তার বেতন ১৭শ টাকা। বেতনকে তোয়াক্কা না করে নেমে পড়ে অবৈধ কাজে। এক এক করে সব কাজ সে হাতিয়ে নেয়। এক এক করে সম্পদের পরিমাণ বাড়তে থাকে। গরুর খামার, জমি, বাসা বাড়ি, কৃষি জমি, পুকুর, প্রজেক্ট এবং নিজ ও আত্মীয় স্বজন ছাড়াও নানান নামে সম্পদ গড়েছেন তিনি। সুখনগরীতে সরকারী খাস জমি দখল করে এখানে খামার গড়ে তুলেছেন।

কয়েক বছর আগে স্থানীয় ব্যবসায়ী আতাউর রহমান আবু তালুকদারের কাছ থেকে উপজেলা পরিষদের কাছে কোটি টাকা দিয়ে জমি ক্রয় করেন। এখানেও তার জমির দাম কম ও ভুয়া শ্রেণি বসিয়ে কম মূল্যে জমি রেজিস্ট্রি করে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। এই দলিলে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়। এই জমিতে পাঁচতলা ফাউন্ডেশন দিয়ে একটি বাড়ী তৈরী করছেন। তার কাজ এখনো শেষ হয়নি। দুতলা পর্যন্ত করেছেন। এছাড়া পালপাড়ায় একটি দুতলা সুরম্য একটি বাড়ি রয়েছে। গ্রামের বাড়িতে রয়েছে একাধিক ঘর, বাগান, গরুর খামার, পুকুর, এক একর আবাদী জমি। এসব দেখে গ্রামবাসী হতবাক। উপজেলা কমপ্লেক্স এলাকায় তার প্রাসাদের খোঁজ নিতে গেলে ভয়ে কেও মুখ খুলে না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ব্যক্তি জানান, তার অফিসের একদল সন্ত্রাসী কেউ কথা বললেই হুমকি দেয়। তারা জানান, এই জাহাঙ্গীরের হাতে আলাদিনের চেরাগ আছে। রাতা-রাতি তাকে কোটিপতি বানিয়েছে। সাব রেজিস্ট্রি অফিস তার কথায় চলে।

সুখনগরী গ্রামে খোঁজ নিলে একাধিক গ্রামবাসী জানান, সে অল্প দিনে এতো টাকার মালিক হয়েছে। তার অবৈধ টাকায় এসব কেনা।

এ বিষয়ে অভিযুক্ত জাহাঙ্গীর আলমের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি কথা বলতে রাজি হয়নি। তিনি বার বার তার বিরুদ্ধে খবর না দিতে অনুরোধ করেন।

মাদারগঞ্জ উপজেলায় স্থায়ী সাব রেজিস্ট্রার না থাকায় বর্তমান সাব রেজিস্ট্রার কথা বলতে রাজি হয়নি।

জেলা রেজিস্ট্রার মো. শাহজাহান জানান, এটা মাদাগঞ্জ সাব রেজিস্ট্রি অফিসের আওতায় তাদের সাথে কথা বলুন।

জনপ্রিয় সংবাদ

নিলামে ২০৬ মিলিয়ন ডলার কিনল বাংলাদেশ ব্যাংক

সাব রেজিস্ট্রি অফিসের নৈশ প্রহরীর কোটি কোটি টাকার সম্পদ

আপডেট সময় : ০৪:৩৩:৪৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৩ জুলাই ২০২৪

জামালপুরের মাদারগঞ্জ সাব রেজিস্ট্রি অফিসে মাস্টার রোলে নৈশ প্রহরী পদে চাকরী করেন জাহাঙ্গীর আলম। বেতন ১৭শ টাকা। অথচ আজ কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের মালিক।

জানা যায়, মাদারগঞ্জ উপজেলা কমপ্লেক্সের কাছে কোটি টাকার জমিতে কয়েক কোটি টাকায়  তৈরী করেছেন রাজ প্রাসাদ, গরুর খামার, আবাদী জমি, নিজের থাকার রাজকীয় বাড়ি, একাধিক বাসা বাড়ি, আবাদী জমি, পুকুর কোন কিছুর অভাব নেই। রয়েছে সরকারী খাস জমি দখল করে গরুর খামারসহ একাধিক পাকা বাড়ির অভিযোগও। সবকিছু হয়েছে মাদারগঞ্জ সাব রেজিষ্ট্রি অফিসের বদৌলতে। কয়েক বছর আগে দিন মজুরের কাজ করেছেন এই জাহাঙ্গীর। এখন কোটি কোটি টাকার মালিক বনে গেছে।

সরেজমিনে জানা যায়, ১২ বছর আগে সাব রেজিস্ট্রি অফিসের কর্মকর্তাদের খাবার রান্নার কাজ করতে গিয়ে সে মাস্টার রোলে চাকরী পেয়ে যান। এখানেই তার ভাগ্য খুলে যায়। রাতারাতি সে অফিসের গোপন কাজের সাথে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন। রাতের অফিসে গোপন কাজগুলো তার হুকুমেই চলে। যতো অনৈতিক অবৈধ কাজ হয় সবটার ভাগ যায় তার হাতে। জমি রেজিস্ট্রি, দলিল রেজিস্ট্রির কমিশন, নকল উত্তোলনসহ সব অবৈধ কাজ তার হাত ছাড়া হয় না। এক কথায় তিনি ২য় সাব রেজিস্ট্রার বলে জানে অফিসের লোকজন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন দলিল লেখক ও অফিসের কর্মচারী জানান, এ অফিসে জাহাঙ্গীরের একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। তার সুপারিশে আরো কয়েকজন হোমড়া চোমড়া ছেলেদের নকল নবিশের চাকরী দিয়ে তার হাত শক্তিশালী করেছেন। কেউ প্রতিবাদ করলে তারা হুমকি দেয় এমনকি মারার ভয় দেখিয়ে মুখ বন্ধ করে রাখে। তার সিন্ডিকেটের কয়েকজনের কাছে পুরো সাব রেজিস্ট্রি কার্যালয় জিম্মি হয়ে পড়েছে।

এলাকাবাসীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, জাহাঙ্গীর আলমের বাড়ি উপজেলার সুখনগরী গ্রামে। নদী ভাঙ্গনের পর সে উপজেলা শহরের পাল পাড়ায় আশ্রয় নেয়। এক সময় দিনমজুরী কামলা খাটতো, পরে কয়েজনের বাড়িতে বছর বান্দা কামলা হিসেবে কাজ শুরু করে জাহাঙ্গীর। এক সময় কাজ রেখে উপজেলার বিভিন্ন অফিসে ছোট খাট হাত ফরমায়েসী কাজ করতেন। পরে তার স্থিতি হয় উপজেলা সাব রেজেষ্ট্রি অফিসে। সেখানে  অফিসারদের রান্না ও ঘর মুছার কাজ করতেন। কাজ শুরু করার পর তৎকালীন এক সাব রেজিষ্ট্রার তাকে দিয়ে অফিসের ছোট খাটো কাজ করানো শুরু করে। এক সময় সে মাস্টার রোলে ওই অফিসের  নৈশপ্রহরীর কাজ পায় ৩শ টাকার বেতনে। বর্তমানে তার বেতন ১৭শ টাকা। বেতনকে তোয়াক্কা না করে নেমে পড়ে অবৈধ কাজে। এক এক করে সব কাজ সে হাতিয়ে নেয়। এক এক করে সম্পদের পরিমাণ বাড়তে থাকে। গরুর খামার, জমি, বাসা বাড়ি, কৃষি জমি, পুকুর, প্রজেক্ট এবং নিজ ও আত্মীয় স্বজন ছাড়াও নানান নামে সম্পদ গড়েছেন তিনি। সুখনগরীতে সরকারী খাস জমি দখল করে এখানে খামার গড়ে তুলেছেন।

কয়েক বছর আগে স্থানীয় ব্যবসায়ী আতাউর রহমান আবু তালুকদারের কাছ থেকে উপজেলা পরিষদের কাছে কোটি টাকা দিয়ে জমি ক্রয় করেন। এখানেও তার জমির দাম কম ও ভুয়া শ্রেণি বসিয়ে কম মূল্যে জমি রেজিস্ট্রি করে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। এই দলিলে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়। এই জমিতে পাঁচতলা ফাউন্ডেশন দিয়ে একটি বাড়ী তৈরী করছেন। তার কাজ এখনো শেষ হয়নি। দুতলা পর্যন্ত করেছেন। এছাড়া পালপাড়ায় একটি দুতলা সুরম্য একটি বাড়ি রয়েছে। গ্রামের বাড়িতে রয়েছে একাধিক ঘর, বাগান, গরুর খামার, পুকুর, এক একর আবাদী জমি। এসব দেখে গ্রামবাসী হতবাক। উপজেলা কমপ্লেক্স এলাকায় তার প্রাসাদের খোঁজ নিতে গেলে ভয়ে কেও মুখ খুলে না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ব্যক্তি জানান, তার অফিসের একদল সন্ত্রাসী কেউ কথা বললেই হুমকি দেয়। তারা জানান, এই জাহাঙ্গীরের হাতে আলাদিনের চেরাগ আছে। রাতা-রাতি তাকে কোটিপতি বানিয়েছে। সাব রেজিস্ট্রি অফিস তার কথায় চলে।

সুখনগরী গ্রামে খোঁজ নিলে একাধিক গ্রামবাসী জানান, সে অল্প দিনে এতো টাকার মালিক হয়েছে। তার অবৈধ টাকায় এসব কেনা।

এ বিষয়ে অভিযুক্ত জাহাঙ্গীর আলমের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি কথা বলতে রাজি হয়নি। তিনি বার বার তার বিরুদ্ধে খবর না দিতে অনুরোধ করেন।

মাদারগঞ্জ উপজেলায় স্থায়ী সাব রেজিস্ট্রার না থাকায় বর্তমান সাব রেজিস্ট্রার কথা বলতে রাজি হয়নি।

জেলা রেজিস্ট্রার মো. শাহজাহান জানান, এটা মাদাগঞ্জ সাব রেজিস্ট্রি অফিসের আওতায় তাদের সাথে কথা বলুন।