সভ্য সমাজ যখন নির্বিচারে বন জঙ্গল উড়িয়ে দিব্যি সুখে দিন কাটাচ্ছে, তখন মুক্তিযোদ্ধা দেলোয়ার পাটওয়ারী ভাবছেন কোথায় একটি গাছ লাগানো যায়। গাছই পুরো পৃথিবীকে আগলে ধরে আছে। গাছ না থাকলে এই পৃথিবীতে প্রানীকূলের কোন অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যেত না। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া মুক্তিযোদ্ধা দেলোয়ার পাটওয়ারী এখনও গাছ লাগিয়ে ও পরিচর্যা করে পোকা মাকড়ের হাত থেকে রক্ষা করছেন। শুধু বৃক্ষ নই কবুতর, মোরগ, গরু পালন ও মাছ চাষের সাথেও রয়েছে তাঁর সখ্যতা।
স্বাধীনতা যুদ্ধ শেষে উদ্যোগী হয়ে ওঠা মুক্তিযোদ্ধা দেলোয়ার পাটওয়ারীর পুরো নাম মো. দেলোয়ার হোসেন পাটওয়ারী (৬৮)। চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জ উপজেলার পাইকপাড়া দক্ষিণ ইউনিয়নের কড়ৈতলী গ্রামের এক নিভৃত পল্লীতে যার জন্ম। তিনি ওই গ্রামের ইউসুফ আলী পাটওয়ারী ও আক্তারের নেছা দম্পত্তির ছেলে। ৭১’র মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ গ্রহণকারী এই মুক্তিযোদ্ধা বাংলাদেশ আনসার ভিডিপির সাথেও সম্পৃক্ত। বর্তমানে নিজ ইউনিয়নের আনসার ভিডিপির দলনেতা হিসেবে দায়িত্বপালন করছেন তিনি। স্থানীয়দের ধর্ম-কর্ম পালনের স্বার্থে বাড়ির পাশে গড়ে তুলেছেন দৃষ্টি নন্দন জামে মসজিদ ও শিক্ষা বিস্তারের জন্য করেছেন দৃষ্টি নন্দন একটি মাদ্রাসা।
জানা যায়, সমাজসেবক, শিক্ষানুরাগী মুক্তিযোদ্ধা দেলোয়ার পাটওয়ারী কিশোর বয়স থেকেই গাছ লাগানো তাঁর নেশা। নিজের কাছে টাকা থাকলেই সবকিছুর আগে গাছ ক্রয় করতেন। প্রায় ৫০ বছর ধরে বৃক্ষের সাথে মিতালি গড়েছেন তিনি। তাঁর বাড়ির আঙিনা কিংবা উঠোনে। ঘরের কোনায় কিংবা পুকুর পাড়ে। বসতভিটা জুড়ে গাছ আর গাছ। সবই বিরল জাতের ফল, ফুল, ওষুধি ও বনজ প্রজাতের গাছ। অন্তত ১০০ জাতের ১২ হাজার গাছ রোপণ করেছেন তিনি। যেখানেই বিরল জাতের গাছ পান সেখান থেকেই সংগ্রহ করে রোপন করে থাকেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সবুজ প্রকৃতিতে ঘেরা বসতভিটা। আঙিনা, উঠোনে, আনাচে কানাচে কেবল বিরল জাতের গাছ। বৃদ্ধ বয়সেও গাছের পরিচর্যা করছেন তিনি। গাছপাগল এ মানুষটি এলাকা জুড়ে সুনাম কুড়িয়েছেন। ৩২০ শতক জমিতে ১০০ জাতের প্রায় ১২ হাজার গাছ রয়েছে তাঁর। ফলজ, বনজ, ঔষধি ও মসলার বিভিন্ন প্রকারের গাছ।
এছাড়া ২১০ শতক সম্পত্তিতে বিশাল আকৃতির দুইটি মাছের খামারে নানান জাতের ১৬ হাজার মাছ চাষ করেছেন। মাছের খামারের পাড় জুড়ে নানান প্রজাতির গাছ বিস্তৃত। দুর থেকে দেখা যায় শুধু সবুজের সমারোহ।
মুক্তিযোদ্ধা দেলোয়ার হোসেন পাটওয়ারীর স্ত্রী রওশন আরা বলেন, তিনি গাছ ছাড়া আর কিছু বোঝেন না। বাজারের টাকা বাঁচিয়ে গাছ কিনে নিয়ে আসেন। তিনি একজন গাছ প্রেমিক মানুষ। নিজেই এখন চলাফেরা করতে কষ্ট হলেও সকাল বিকাল গাছের পরিচর্যা করতে ভুলেন না।
তার ছেলে সাবেক ইউপি সদস্য আলী হায়দার উজ্জ্বল পাটওয়ারী জানান, আমি ছোট বেলা থেকেই দেখছি বাবা গাছের পাগল। গাছের চারা দেখলেই কিনবে। অনেক সময় আমরা বিরক্ত হয়েছিলাম। এত গাছ দিয়ে কী হবে বা কি কাজে আসবে? এখন অনেক দূর দুরান্ত থেকে লোকজন আমাদের বাড়িতে আসছেন বিরল প্রজাতির গাছ দেখতে। এসব দেখে ভালই লাগে।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. মুসা, তাজুল ইসলামসহ আরো অনেকেই বলেন, মুক্তিযোদ্ধা দেলোয়ার পাটওয়ারী একজন বৃক্ষপ্রেমি মানুষ। তিনি বয়সের ভারে ঠিকমতে নিজেই চলাফেরা করতে পারে না। কিন্তু তারপরও গাছের পরির্চযা করেন। তিনি গাছ দেখলে বসে থাকতে পারেন না। সকালে উঠেই গাছের দেখাশুনা শুরু করেন।
মুক্তিযোদ্ধা দেলোয়ার হোসেন পাটওয়ারী জানান, কিশোর বয়সে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছি। দেশ স্বাধীন হওয়ারপর নিজের গ্রামের মানুষের জন্য কিছু করা প্রয়োজন মনে করেছি,সেই দায়বদ্ধতা থেকে মসজিদ, মাদ্রাসা নির্মাণ করেছি। বাংলাদেশ আনসার ভিডিপির সাথেও সম্পৃক্ত হয়েছি। জীবনের অনেকটা সময় গাছের সঙ্গেই কাটিয়েছি। ছেলেমেয়ের মতই আমি গাছকে ভালোবাসি। তিনি আরও বলেন, আমার নিজ বাড়ীতে কবুতর, মোরগ, গরু, মাছ ও গাছ নিজেদের পরিবার,স্বজন,প্রতিবেশিকে বিলিয়ে দেয়ার পাশাপাশি বিক্রিও করে থাকি। এতে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছি। আমি মনে করি বর্তমান বেকার তরুণরা চাকুরীর পেছনে না ছুটে উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন।
এসব বিষয়ে ফরিদগঞ্জ উপজেলা বন কর্মকর্তা কাউসার মিয়া বলেন, মুক্তিযোদ্ধা মো. দেলোয়ার হোসেন পাটওয়ারীর বাড়িতে আমি নিজেই বেশ কয়েকবার গিয়েছি। তার বসতভিটায় বিরল প্রজাতির গাছ রয়েছে। এ ছাড়া অন্যান্য প্রজাতির গাছও রয়েছে। নিজের চেষ্টায় তিনি এগুলো সংগ্রহ করেছেন। সত্যই তিনি একজন গাছ প্রেমিক মানুষ। তার উদ্যোগ এই উপজেলার বনবিভাগে দৃষ্টান্ত ও যুবসমাজের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে বলে আমি মনে করি।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা বেলায়েত হোসেন বলেন, মুক্তিযোদ্ধা মো. দেলোয়ার হোসেন পাটওয়ারীর বাড়িতে মাছের খামারের নিয়মিত আমাদের তদারকি রয়েছে। ওনার এমন উদ্যোগ দেখে বেকার সমাজ উদ্যোগী হবে বলে আমি মনে করি। তার মাছের খামারের দু’পাশে সবুজের সমারোহ যে কোন মানুষের দৃষ্টি কাড়বে।


























