০৬:৩৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০২ জানুয়ারী ২০২৬, ১৯ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

দরকষাকষিতে মিলবে জিম্মি জাহাজের মুক্তি

➤মালিকপক্ষের সঙ্গে জলদস্যুদের যোগাযোগ
➤সুস্থ আছেন ২৩ নাবিক
➤তৃতীয় মাধ্যমে তৈরি হচ্ছে আলোচনার পরিবেশ
➤সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে মালিকপক্ষের

অবশেষে ২৩ নাবিকসহ বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজ এমভি আবদুল্লাহ জিম্মি করার আট দিন পর মালিকপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে সোমালিয়ার জলদস্যুরা। জিম্মি জাহাজের নাবিকরা সবাই সুস্থ রয়েছেন। তবে ধারণা করা হচ্ছে, দরকষাকষিতেই মুক্তি মিলতে পারে জিম্মি জাহাজসহ নাবিকদের। গতকাল বুধবার বিকালে জিম্মি জাহাজের মালিকপক্ষের সঙ্গে জলদস্যুদের যোগাযোগের বিষয়টি দৈনিক সবুজ বাংলাকে নিশ্চিত করেছেন বাংলাদেশি শিল্প গ্রুপ কেএসআরএমের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান এসআর শিপিংয়ের মালিকানাধীন এমভি আবদুল্লাহ জাহাজটির মালিকপক্ষ কবির গ্রুপের মিডিয়া উপদেষ্টা মিজানুল ইসলাম।

তিনি বলেন, গতকাল দুপুর ২টার দিকে জিম্মি জাহাজ এমভি আবদুল্লাহ’র জলদস্যুরা তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। তারা কোনো দাবি জানায়নি। তবে জাহাজে থাকা জিম্মি নাবিকরা সবাই সুস্থ আছে বলে তারা নিশ্চিত করেছে।

মিজানুল ইসলাম বলেন, তারা তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। এতে করে এখন আলোচনা করার পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। এটা ধীরে ধীরে আলোচনায় ওঠে আসবে। আমরা ২৩ নাবিককে দ্রুত ফিরিয়ে আনতে যা যা করার তার সবটুকু চেষ্টা চালাচ্ছি। এরই মধ্যে আমরা সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি, তাই আশা করছি তাদের সঙ্গে আলোচনা শুরু হলে এই সমস্যার সমাধান হবে। জলদস্যুরা মুক্তিপণ দাবি করেছে কি না বা কী কথা হয়েছে, জানতে চাইলে এ বিষয়ে এখনই বিস্তারিত কিছু জানাতে রাজি হননি মিজানুল ইসলাম। তিনি বলেন, মাত্র আলোচনার দুয়ার খুলছে। এই মুহূর্তে কিছু বলা সঠিক হবে না। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যোগাযোগ শুরু হওয়ায় এখন জলদস্যুরা মুক্তিপণ দাবি করতে পারে। দরকষাকষি করে সমঝোতায় পৌঁছালে জাহাজসহ নাবিকদের মুক্তি মিলতে পারে।

এদিকে ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম ব্যুরো (আইএমবি) থেকে তথ্য নিয়ে জিম্মি জাহাজটির সর্বশেষ অবস্থান সম্পর্কে জানতে পেরেছে বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন। সংস্থাটির ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী বলেন, উন্মুক্ত সাগরে জলসদ্যুদের শক্তি একরকম। অন্যদিকে উপকূলে তাদের শক্তি বহুগুণে বেড়ে যায়। এমভি আবদুল্লাহর বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনোভাবেই সামরিক অভিযান পরিচালনার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, সমস্যার সমাধানের জন্য জাহাজ মালিক এবং বাংলাদেশ সরকার আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সমাধানের যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেটি শতভাগ সঠিক সিদ্ধান্ত। এর ব্যত্যয় ঘটলে বড় ধরনের বিপর্যয় এমনকি নাবিকদের প্রাণহানি, জাহাজের ক্ষয়ক্ষতি এবং কয়লা বিষ্ফোরণ হয়ে মারাত্বক পরিবেশ বিপর্যয় ঘটার আশঙ্কার কথা উল্লেখ করেন তিনি। বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক শাখাওয়াত হোসেন বলেন, গত ১২ মার্চ সোমালিয়া উপকূল থেকে ৬০০ নটিক্যাল মাইল দূরে ভারত মহাসাগরে বাংলাদেশি জাহাজ এমভি আবদুল্লাহ ছিনতাই করে জলদস্যুরা। এর তিন দিনের মাথায় নাবিকসহ জিম্মি জাহাজটি সোমালিয়ার উপকূলে নিয়ে যাওয়া হয়। জিম্মি নাবিকসহ জাহাজটি অনুসরণ করতে থাকে ইইউ ও ভারতীয় নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ। এতে নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে ও ছিনতাই করা জাহাজ নিয়ন্ত্রণে রাখতে দুই দফা স্থান পরিবর্তন করেছে। এখন দেড় নটিক্যাল মাইল দূরে আছে এটি। প্রথমে গ্যারাকাদ থেকে ২০ নটিক্যাল মাইল দূরে নোঙর করে রাখা হয়েছিল। তখন উপকূল থেকে জাহাজে যেতে প্রায় দুই ঘণ্টা সময় লাগত। এরপর জাহাজটির অবস্থান পরিবর্তন করে উপকূল থেকে ৪ নটিক্যাল মাইল দূরে নিয়ে আসে তারা। সর্বশেষ আবার অবস্থান পরিবর্তন করে জলদস্যুরা। এখন জাহাজটিকে সোমালিয়া উপকূল থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে রাখা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, জাহাজটি ৫৫ হাজার মেট্রিক টন কয়লা নিয়ে ৪ মার্চ আফ্রিকার মোজাম্বিকের মাপুটো বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করে। ১৯ মার্চ সেটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের হামরিয়াহ বন্দরে পৌঁছানোর কথা ছিল। নাবিক ও ক্রুসহ জাহাজটিতে ২৩ জন বাংলাদেশি রয়েছেন। ১২ মার্চ বাংলাদেশ সময় বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে জাহাজটি ভারত মহাসাগর থেকে সোমালিয়ার উপকূলে নিয়ে যাওয়ার কাজ শুরু করে জলদস্যুরা। জাহাজটি ওই সময় সোমালিয়া উপকূল থেকে ৪৫০ নটিক্যাল মাইল দূরে অবস্থান করছিল।

জলদস্যুদের কবলে ছিনতাই হওয়া বাংলাদেশি শীর্ষ শিল্প প্রতিষ্ঠান কেএসআরএমের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান এসআর শিপিংয়ের মালিকানাধীন ‘এমভি আবদুল্লাহ’ আগে ‘গোল্ডেন হক’ নামে পরিচিত ছিল। ২০১৬ সালে তৈরি বাল্ক ক্যারিয়ারটির দৈর্ঘ্য ১৮৯ দশমিক ৯৩ মিটার এবং প্রস্থ ৩২ দশমিক ২৬ মিটার। গত বছর জাহাজটি এসআর শিপিং কিনে নেয়। বিভিন্ন ধরনের পণ্য নিয়ে আন্তর্জাতিক রুটে চলাচলকারী এরকম ২৩টি জাহাজ আছে কবির গ্রুপের বহরে। এর আগে ২০১০ সালের ডিসেম্বরে আরব সাগরে সোমালি জলদস্যুদের কবলে পড়েছিল বাংলাদেশি জাহাজ জাহান মণি। ওই সময় জাহাজের ২৫ নাবিক এবং প্রধান প্রকৌশলীর স্ত্রীকে জিম্মি করা হয়। নানাভাবে চেষ্টার পর ১০০ দিনের চেষ্টায় জলদস্যুদের কবল থেকে মুক্তি পান তারা।

 

 

জনপ্রিয় সংবাদ

দরকষাকষিতে মিলবে জিম্মি জাহাজের মুক্তি

আপডেট সময় : ০৫:৩০:০৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২১ মার্চ ২০২৪

➤মালিকপক্ষের সঙ্গে জলদস্যুদের যোগাযোগ
➤সুস্থ আছেন ২৩ নাবিক
➤তৃতীয় মাধ্যমে তৈরি হচ্ছে আলোচনার পরিবেশ
➤সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে মালিকপক্ষের

অবশেষে ২৩ নাবিকসহ বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজ এমভি আবদুল্লাহ জিম্মি করার আট দিন পর মালিকপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে সোমালিয়ার জলদস্যুরা। জিম্মি জাহাজের নাবিকরা সবাই সুস্থ রয়েছেন। তবে ধারণা করা হচ্ছে, দরকষাকষিতেই মুক্তি মিলতে পারে জিম্মি জাহাজসহ নাবিকদের। গতকাল বুধবার বিকালে জিম্মি জাহাজের মালিকপক্ষের সঙ্গে জলদস্যুদের যোগাযোগের বিষয়টি দৈনিক সবুজ বাংলাকে নিশ্চিত করেছেন বাংলাদেশি শিল্প গ্রুপ কেএসআরএমের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান এসআর শিপিংয়ের মালিকানাধীন এমভি আবদুল্লাহ জাহাজটির মালিকপক্ষ কবির গ্রুপের মিডিয়া উপদেষ্টা মিজানুল ইসলাম।

তিনি বলেন, গতকাল দুপুর ২টার দিকে জিম্মি জাহাজ এমভি আবদুল্লাহ’র জলদস্যুরা তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। তারা কোনো দাবি জানায়নি। তবে জাহাজে থাকা জিম্মি নাবিকরা সবাই সুস্থ আছে বলে তারা নিশ্চিত করেছে।

মিজানুল ইসলাম বলেন, তারা তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। এতে করে এখন আলোচনা করার পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। এটা ধীরে ধীরে আলোচনায় ওঠে আসবে। আমরা ২৩ নাবিককে দ্রুত ফিরিয়ে আনতে যা যা করার তার সবটুকু চেষ্টা চালাচ্ছি। এরই মধ্যে আমরা সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি, তাই আশা করছি তাদের সঙ্গে আলোচনা শুরু হলে এই সমস্যার সমাধান হবে। জলদস্যুরা মুক্তিপণ দাবি করেছে কি না বা কী কথা হয়েছে, জানতে চাইলে এ বিষয়ে এখনই বিস্তারিত কিছু জানাতে রাজি হননি মিজানুল ইসলাম। তিনি বলেন, মাত্র আলোচনার দুয়ার খুলছে। এই মুহূর্তে কিছু বলা সঠিক হবে না। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যোগাযোগ শুরু হওয়ায় এখন জলদস্যুরা মুক্তিপণ দাবি করতে পারে। দরকষাকষি করে সমঝোতায় পৌঁছালে জাহাজসহ নাবিকদের মুক্তি মিলতে পারে।

এদিকে ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম ব্যুরো (আইএমবি) থেকে তথ্য নিয়ে জিম্মি জাহাজটির সর্বশেষ অবস্থান সম্পর্কে জানতে পেরেছে বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন। সংস্থাটির ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী বলেন, উন্মুক্ত সাগরে জলসদ্যুদের শক্তি একরকম। অন্যদিকে উপকূলে তাদের শক্তি বহুগুণে বেড়ে যায়। এমভি আবদুল্লাহর বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনোভাবেই সামরিক অভিযান পরিচালনার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, সমস্যার সমাধানের জন্য জাহাজ মালিক এবং বাংলাদেশ সরকার আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সমাধানের যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেটি শতভাগ সঠিক সিদ্ধান্ত। এর ব্যত্যয় ঘটলে বড় ধরনের বিপর্যয় এমনকি নাবিকদের প্রাণহানি, জাহাজের ক্ষয়ক্ষতি এবং কয়লা বিষ্ফোরণ হয়ে মারাত্বক পরিবেশ বিপর্যয় ঘটার আশঙ্কার কথা উল্লেখ করেন তিনি। বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক শাখাওয়াত হোসেন বলেন, গত ১২ মার্চ সোমালিয়া উপকূল থেকে ৬০০ নটিক্যাল মাইল দূরে ভারত মহাসাগরে বাংলাদেশি জাহাজ এমভি আবদুল্লাহ ছিনতাই করে জলদস্যুরা। এর তিন দিনের মাথায় নাবিকসহ জিম্মি জাহাজটি সোমালিয়ার উপকূলে নিয়ে যাওয়া হয়। জিম্মি নাবিকসহ জাহাজটি অনুসরণ করতে থাকে ইইউ ও ভারতীয় নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ। এতে নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে ও ছিনতাই করা জাহাজ নিয়ন্ত্রণে রাখতে দুই দফা স্থান পরিবর্তন করেছে। এখন দেড় নটিক্যাল মাইল দূরে আছে এটি। প্রথমে গ্যারাকাদ থেকে ২০ নটিক্যাল মাইল দূরে নোঙর করে রাখা হয়েছিল। তখন উপকূল থেকে জাহাজে যেতে প্রায় দুই ঘণ্টা সময় লাগত। এরপর জাহাজটির অবস্থান পরিবর্তন করে উপকূল থেকে ৪ নটিক্যাল মাইল দূরে নিয়ে আসে তারা। সর্বশেষ আবার অবস্থান পরিবর্তন করে জলদস্যুরা। এখন জাহাজটিকে সোমালিয়া উপকূল থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে রাখা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, জাহাজটি ৫৫ হাজার মেট্রিক টন কয়লা নিয়ে ৪ মার্চ আফ্রিকার মোজাম্বিকের মাপুটো বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করে। ১৯ মার্চ সেটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের হামরিয়াহ বন্দরে পৌঁছানোর কথা ছিল। নাবিক ও ক্রুসহ জাহাজটিতে ২৩ জন বাংলাদেশি রয়েছেন। ১২ মার্চ বাংলাদেশ সময় বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে জাহাজটি ভারত মহাসাগর থেকে সোমালিয়ার উপকূলে নিয়ে যাওয়ার কাজ শুরু করে জলদস্যুরা। জাহাজটি ওই সময় সোমালিয়া উপকূল থেকে ৪৫০ নটিক্যাল মাইল দূরে অবস্থান করছিল।

জলদস্যুদের কবলে ছিনতাই হওয়া বাংলাদেশি শীর্ষ শিল্প প্রতিষ্ঠান কেএসআরএমের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান এসআর শিপিংয়ের মালিকানাধীন ‘এমভি আবদুল্লাহ’ আগে ‘গোল্ডেন হক’ নামে পরিচিত ছিল। ২০১৬ সালে তৈরি বাল্ক ক্যারিয়ারটির দৈর্ঘ্য ১৮৯ দশমিক ৯৩ মিটার এবং প্রস্থ ৩২ দশমিক ২৬ মিটার। গত বছর জাহাজটি এসআর শিপিং কিনে নেয়। বিভিন্ন ধরনের পণ্য নিয়ে আন্তর্জাতিক রুটে চলাচলকারী এরকম ২৩টি জাহাজ আছে কবির গ্রুপের বহরে। এর আগে ২০১০ সালের ডিসেম্বরে আরব সাগরে সোমালি জলদস্যুদের কবলে পড়েছিল বাংলাদেশি জাহাজ জাহান মণি। ওই সময় জাহাজের ২৫ নাবিক এবং প্রধান প্রকৌশলীর স্ত্রীকে জিম্মি করা হয়। নানাভাবে চেষ্টার পর ১০০ দিনের চেষ্টায় জলদস্যুদের কবল থেকে মুক্তি পান তারা।