০৫:৪৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২২ এপ্রিল ২০২৪, ৮ বৈশাখ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

ছাত্ররাজনীতি নিয়ে উত্তাল বুয়েট

◉৬ ছাত্রের স্থায়ী বহিষ্কারে শিক্ষার্থীদের আল্টিমেটাম
◉ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস উপাচার্যের
◉ নিষিদ্ধ সংগঠনের স্বার্থ হাসিলের অভিযোগ কয়েকজন শিক্ষার্থীর
◉ ছাত্ররাজনীতির দাবিতে আজ ছাত্রলীগের সমাবেশ

 

 

ছাত্ররাজনীতি মুক্ত নিরাপদ ক্যাম্পাসের দাবিতে আবারও উত্তাল হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)। ক্যাম্পাসে মধ্যরাতে ছাত্রলীগ নেতাদের প্রবেশের প্রতিবাদে দ্বিতীয় দিনের মতো ক্যাম্পাসে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। এ সময় শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে বুয়েটে ছাত্র রাজনীতি ইস্যুর সঙ্গে জড়িত ২১ ব্যাচের শিক্ষার্থী ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সদস্য ইমতিয়াজ রাহিম রাব্বীসহ ৬ জনকে গতকাল দুপুর ২টার মধ্যে স্থায়ী বহিষ্কারের আল্টিমেটাম দেওয়া হয়। সে অনুযায়ী গতকাল সকাল থেকে বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে বিক্ষোভ চলাকালে আল্টিমেটাম সহ ৫ দফা দাবি জানান শিক্ষার্থীরা। দাবি মেনে না নিলে আজও সকাল থেকে বিক্ষোভের ঘোষণা দেন শিক্ষার্থীরা। ‘এক, দুই, তিন চার ডিএসডাব্লিউ গদি ছাড়’, ‘আমি কে তুমিকে, আবরার, আবরার’ ‘বুয়েট বাঁচাও’ ইত্যাদি স্লোগান ও প্লাকার্ড হাতে নিয়ে শ্লোগান দেন শিক্ষার্থীরা। এ আন্দোলনকে ঘিরে নিয়মিত ক্লাস-পরীক্ষাও বর্জন করেন তারা। ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ নেতাদের প্রবেশের ঘটনায় শিক্ষার্থীদের দাবির সঙ্গে ‘সহমত পোষণ’ করে তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন উপাচার্য সত্য প্রসাদ মজুমদার।

 

 

তিনি বলেছেন, শিক্ষার্থীদের দাবি পূরণ করার জন্য যা যা করার, করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন এলে আমরা নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব। নিয়মবহির্ভূতভাবে একজনকে বহিষ্কার করলে সেটা আদালতে টিকবে না। নিয়মের মধ্যে সবকিছু করার জন্য সময়ের প্রয়োজন। যেহেতু রোজার মাস, সময় একটু বেশি দেওয়া উচিত ছিল।

 

ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ থাকা বুয়েটে বুধবার গভীর রাতে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি, দপ্তর সম্পাদকসহ অনেকের প্রবেশের ঘটনার পর থেকে উত্তাল হয়ে উঠেছে ক্যাম্পাস। শিক্ষার্থীরা গতকাল দ্বিতীয় দিনের বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে ছয় শিক্ষার্থীকে স্থায়ী বহিষ্কারের পাশাপাশি আরো কয়েকটি দাবি তুলে ধরেন। এসব দাবি-দাওয়া ও আন্দোলনের প্রসঙ্গে গতকাল দুপুরে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন উপাচার্য। ওই ঘটনা তদন্তে ছয় সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়েছে জানিয়ে সত্য প্রসাদ মজুমদার বলেন, ‘আজকে (শনিবার) তদন্ত কমিটি কাজ শুরু করেছে। আগামী ৮ এপ্রিল পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর এর সদস্যদের মতামতও আমরা শুনব।’

 

২০১৯ সালে শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনার পর শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ হয় বুয়েট ক্যাম্পাসে। শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিমালা লঙ্ঘন করে পুরকৌশল বিভাগের ২১তম ব্যাচের ছাত্র ও ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ইমতিয়াজ হোসেন রাহিম ছাত্রলীগ নেতাদের সমাগম ঘটান। পরে শুক্রবার শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে ইমতিয়াজ হোসেন রাহিমের হলের সিট বাতিল করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
ইমতিয়াজসহ আরো পাঁচ শিক্ষার্থীকে স্থায়ী বহিষ্কারের দাবির বিষয়ে উপাচার্য বলেন, ‘ইমতিয়াজকে হল থেকে বহিষ্কার আমরা করতে পারি। কিন্তু টার্ম বহিষ্কার শৃঙ্খলা কমিটির বৈঠক ডেকে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে করতে হবে। শৃঙ্খলা কমিটির সভার জন্য তদন্ত প্রতিবেদন লাগবে। তদন্ত প্রতিবেদন ছাড়া শৃঙ্খলা কমিটি কোনো ব্যবস্থা নিতে পারবে না। এভাবে শাস্তি দেওয়া হলে আদালতে গিয়েও টিকবে না। ফলে তদন্ত লাগবে এবং তদন্তে অভিযুক্তকেও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে। আমাদের আইন ও নিয়ম অনুযায়ী চলতে হবে। ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের প্রবেশের প্রতিবাদে ৩০ ও ৩১ মার্চের টার্ম ফাইনাল বর্জনসহ সকল একাডেমিক কার্যক্রম বর্জনের ঘোষণা দেন শিক্ষার্থীরা।

 

এ বিষয়ে উপাচার্য বলেন, ‘আমরা পরীক্ষা স্থগিত করিনি। তারা (শিক্ষার্থী) বর্জন করেছেন। তারা পরীক্ষা স্থগিতের আবেদনও করেননি। তারা আবেদন করলে আমরা বিবেচনা করতাম। তারা এখানে ভুল করেছেন। পরীক্ষা হয়েছে, কিন্তু তারা পরীক্ষায় অনুপস্থিত ছিলেন। নিয়ম অনুযায়ী ঘণ্টা বাজবে, ছাত্ররা আসুক না আসুক- এমন ঘটনা বুয়েটে আগেও ঘটেছে। পরে তারা পরীক্ষার জন্য আবেদন করলে একাডেমিক কাউন্সিল বিবেচনা করতে পারে।

 

 

এদিকে অনুমতি ছাড়া ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের প্রবেশে ঘটনায় ছাত্রকল্যাণ দপ্তরের পরিচালক (ডিএসডব্লিউ) অধ্যাপক মিজানুর রহমানের পদত্যাগের যে দাবি তুলেছেন শিক্ষার্থীরা, সেই প্রসঙ্গে উপাচার্য সত্য প্রসাদ বলেন, ডিএসডব্লিউর পদত্যাগের বিষয়ে এখন আমরা চিন্তা করছি না। কারণ, এটা নরমাল একটা প্রসিডিউর। নিয়ম অনুযায়ী যখন হওয়ার হবে। ডিএসডব্লিউ বলেছেন, তার পক্ষ থেকে কোনো গাফিলতি ছিল না। শিক্ষার্থীরা দাবি করতেই পারেন। কিন্তু দাবির মুখে আমরা ব্যবস্থা নিতে পারি না। সময় হলে আমরা নতুন ডিএসডব্লিউ নিয়োগ দেব। মধ্যরাতে ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের প্রবেশ নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে আমরা কারণ দর্শানোর নোটিস দেব যে, কেন তিনি ঢুকতে দিলেন। তার তো ঢুকতে দেওয়া উচিত হয়নি।

 

 

 

গভীর রাতে কেউ (ক্যাম্পাসে) ঢুকলে এটা অবশ্যই অমানবিক বা অনিয়মতান্ত্রিক। কে ঢুকেছে, তাকে তো আগে চিহ্নিত করতে হবে। চিহ্নিত না করে তো শাস্তি দেওয়া যাবে না। তার জন্য সময় প্রয়োজন। যদি কোনো নিরাপত্তারক্ষী বহিরাগত ব্যক্তিদের ঢুকতে দিয়ে থাকেন, তার বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা নেব।

 

 

 

বুয়েটে নিষিদ্ধ সংগঠন স্বার্থ হাসিল করছে: বুয়েট সাধারণ শিক্ষার্থীদের ‘আবেগকে’ ব্যবহার করে ‘নিষিদ্ধ সংগঠন’ স্বার্থ হাসিল করছে বলে অভিযোগ করেছেন প্রতিষ্ঠানটির কয়েকজন শিক্ষার্থী। গতকাল বিকাল ৩টায় বুয়েটের শহীদ মিনারের সামনে সংবাদ সম্মেলন করে এই অভিযোগ করে ২০ ব্যাচের শিক্ষার্থী তানভীর মাহমুদ স্বপ্নীল, আশিক আলম, সাগর বিশ্বাস, অরিত্র ঘোষ ও ২১ ব্যাচের অর্ঘ দাসরা। আরও ২০-২৫ জন উপস্থিত হওয়ার ইচ্ছা থাকলেও ‘বুলিংয়ের’ ভয়ে তারা অংশ নেননি বলে এই শিক্ষার্থীরা দাবি করেন। একইসঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্য করে অন্যান্য শিক্ষার্থীদের ‘বুলিংয়ের’ কিছু স্ক্রিনশট সাংবাদিকদের দেখান।

 

 

এদিকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা জানান, ছবি ও ভিডিও ফুটেজের মাধ্যমে ছাত্রলীগের প্রবেশে সহায়তা করা একাংশের ছবি চিহ্নিত করেছেন বলে দাবি করেছেন শিক্ষার্থীরা। তারা হলেন- বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের এএসএম আনাস ফেরদৌস, ইলেক্ট্রিকাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের মোহাম্মদ হাসিন আরমান নিহাল, অনিরুদ্ধ মজুমদার, সায়েম মাহমুদ সাজেদিন রিফাত এবং নেভাল আর্কিটেকচার অ্যান্ড মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের জাহিরুল ইসলাম ইমন। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম ভাঙায় এই শিক্ষার্থীদেরও বুয়েট থেকে স্থায়ী একাডেমিক এবং হল থেকে বহিষ্কার করতে হবে এবং জড়িত অন্যদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনা হবে। বহিরাগতদের প্রবেশকারীদের বিষয়ে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে কিনা মর্মে প্রশাসন থেকে লিখিত বিজ্ঞপ্তি দেওয়া ও তা বাস্তবায়ন করা।

 

 

দায়িত্ব পালনে অবহেলা করায় ছাত্রকল্যাণ পরিদপ্তরের পরিচালকের পদত্যাগ, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে কোনো হয়রানিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে না মর্মে লিখিত প্রতিশ্রুতি দেওয়া। আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা বলেন, আমাদের আন্দোলনের পর ‘তথাকথিত’ রাজনৈতিক সংগঠনের কিছু ব্যক্তিরা ফেসবুকে পোস্ট করে আন্দোলনের উদ্দেশ্য নিয়ে অপপ্রচার চালিয়েছেন। আমরা তাদের এমন বক্তব্যের ধিক্কার জানাই। তারা বলেন, আমরা সবসময়ই বুয়েটের নীতিমালায় থাকা ‘বুয়েটে সকল রকম ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ’ আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। আমাদের দাবি কোনো বিশেষ ছাত্র সংগঠনের বিরুদ্ধে না। আমরা যেকোনো মূল্যে বুয়েটকে ছাত্ররাজনীতির হাত থেকে মুক্ত রাখতে বদ্ধ পরিকল্প। উপস্থিত শিক্ষার্থীদের গণস্বাক্ষর নিয়ে আবেদনপত্র জমা দিয়েছি। এখনো আমাদের দাবি বাস্তবায়ন হয়নি। আমাদের কয়েকজন শিক্ষার্থী প্রচণ্ড গরমে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তাই আজকের মতো (শনিবার) আন্দোলন স্থগিত করছি।

 

জনপ্রিয় সংবাদ

ছাত্ররাজনীতি নিয়ে উত্তাল বুয়েট

আপডেট সময় : ০৪:৩৪:৪২ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩১ মার্চ ২০২৪

◉৬ ছাত্রের স্থায়ী বহিষ্কারে শিক্ষার্থীদের আল্টিমেটাম
◉ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস উপাচার্যের
◉ নিষিদ্ধ সংগঠনের স্বার্থ হাসিলের অভিযোগ কয়েকজন শিক্ষার্থীর
◉ ছাত্ররাজনীতির দাবিতে আজ ছাত্রলীগের সমাবেশ

 

 

ছাত্ররাজনীতি মুক্ত নিরাপদ ক্যাম্পাসের দাবিতে আবারও উত্তাল হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)। ক্যাম্পাসে মধ্যরাতে ছাত্রলীগ নেতাদের প্রবেশের প্রতিবাদে দ্বিতীয় দিনের মতো ক্যাম্পাসে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। এ সময় শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে বুয়েটে ছাত্র রাজনীতি ইস্যুর সঙ্গে জড়িত ২১ ব্যাচের শিক্ষার্থী ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সদস্য ইমতিয়াজ রাহিম রাব্বীসহ ৬ জনকে গতকাল দুপুর ২টার মধ্যে স্থায়ী বহিষ্কারের আল্টিমেটাম দেওয়া হয়। সে অনুযায়ী গতকাল সকাল থেকে বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে বিক্ষোভ চলাকালে আল্টিমেটাম সহ ৫ দফা দাবি জানান শিক্ষার্থীরা। দাবি মেনে না নিলে আজও সকাল থেকে বিক্ষোভের ঘোষণা দেন শিক্ষার্থীরা। ‘এক, দুই, তিন চার ডিএসডাব্লিউ গদি ছাড়’, ‘আমি কে তুমিকে, আবরার, আবরার’ ‘বুয়েট বাঁচাও’ ইত্যাদি স্লোগান ও প্লাকার্ড হাতে নিয়ে শ্লোগান দেন শিক্ষার্থীরা। এ আন্দোলনকে ঘিরে নিয়মিত ক্লাস-পরীক্ষাও বর্জন করেন তারা। ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ নেতাদের প্রবেশের ঘটনায় শিক্ষার্থীদের দাবির সঙ্গে ‘সহমত পোষণ’ করে তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন উপাচার্য সত্য প্রসাদ মজুমদার।

 

 

তিনি বলেছেন, শিক্ষার্থীদের দাবি পূরণ করার জন্য যা যা করার, করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন এলে আমরা নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব। নিয়মবহির্ভূতভাবে একজনকে বহিষ্কার করলে সেটা আদালতে টিকবে না। নিয়মের মধ্যে সবকিছু করার জন্য সময়ের প্রয়োজন। যেহেতু রোজার মাস, সময় একটু বেশি দেওয়া উচিত ছিল।

 

ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ থাকা বুয়েটে বুধবার গভীর রাতে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি, দপ্তর সম্পাদকসহ অনেকের প্রবেশের ঘটনার পর থেকে উত্তাল হয়ে উঠেছে ক্যাম্পাস। শিক্ষার্থীরা গতকাল দ্বিতীয় দিনের বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে ছয় শিক্ষার্থীকে স্থায়ী বহিষ্কারের পাশাপাশি আরো কয়েকটি দাবি তুলে ধরেন। এসব দাবি-দাওয়া ও আন্দোলনের প্রসঙ্গে গতকাল দুপুরে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন উপাচার্য। ওই ঘটনা তদন্তে ছয় সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়েছে জানিয়ে সত্য প্রসাদ মজুমদার বলেন, ‘আজকে (শনিবার) তদন্ত কমিটি কাজ শুরু করেছে। আগামী ৮ এপ্রিল পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর এর সদস্যদের মতামতও আমরা শুনব।’

 

২০১৯ সালে শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনার পর শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ হয় বুয়েট ক্যাম্পাসে। শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিমালা লঙ্ঘন করে পুরকৌশল বিভাগের ২১তম ব্যাচের ছাত্র ও ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ইমতিয়াজ হোসেন রাহিম ছাত্রলীগ নেতাদের সমাগম ঘটান। পরে শুক্রবার শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে ইমতিয়াজ হোসেন রাহিমের হলের সিট বাতিল করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
ইমতিয়াজসহ আরো পাঁচ শিক্ষার্থীকে স্থায়ী বহিষ্কারের দাবির বিষয়ে উপাচার্য বলেন, ‘ইমতিয়াজকে হল থেকে বহিষ্কার আমরা করতে পারি। কিন্তু টার্ম বহিষ্কার শৃঙ্খলা কমিটির বৈঠক ডেকে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে করতে হবে। শৃঙ্খলা কমিটির সভার জন্য তদন্ত প্রতিবেদন লাগবে। তদন্ত প্রতিবেদন ছাড়া শৃঙ্খলা কমিটি কোনো ব্যবস্থা নিতে পারবে না। এভাবে শাস্তি দেওয়া হলে আদালতে গিয়েও টিকবে না। ফলে তদন্ত লাগবে এবং তদন্তে অভিযুক্তকেও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে। আমাদের আইন ও নিয়ম অনুযায়ী চলতে হবে। ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের প্রবেশের প্রতিবাদে ৩০ ও ৩১ মার্চের টার্ম ফাইনাল বর্জনসহ সকল একাডেমিক কার্যক্রম বর্জনের ঘোষণা দেন শিক্ষার্থীরা।

 

এ বিষয়ে উপাচার্য বলেন, ‘আমরা পরীক্ষা স্থগিত করিনি। তারা (শিক্ষার্থী) বর্জন করেছেন। তারা পরীক্ষা স্থগিতের আবেদনও করেননি। তারা আবেদন করলে আমরা বিবেচনা করতাম। তারা এখানে ভুল করেছেন। পরীক্ষা হয়েছে, কিন্তু তারা পরীক্ষায় অনুপস্থিত ছিলেন। নিয়ম অনুযায়ী ঘণ্টা বাজবে, ছাত্ররা আসুক না আসুক- এমন ঘটনা বুয়েটে আগেও ঘটেছে। পরে তারা পরীক্ষার জন্য আবেদন করলে একাডেমিক কাউন্সিল বিবেচনা করতে পারে।

 

 

এদিকে অনুমতি ছাড়া ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের প্রবেশে ঘটনায় ছাত্রকল্যাণ দপ্তরের পরিচালক (ডিএসডব্লিউ) অধ্যাপক মিজানুর রহমানের পদত্যাগের যে দাবি তুলেছেন শিক্ষার্থীরা, সেই প্রসঙ্গে উপাচার্য সত্য প্রসাদ বলেন, ডিএসডব্লিউর পদত্যাগের বিষয়ে এখন আমরা চিন্তা করছি না। কারণ, এটা নরমাল একটা প্রসিডিউর। নিয়ম অনুযায়ী যখন হওয়ার হবে। ডিএসডব্লিউ বলেছেন, তার পক্ষ থেকে কোনো গাফিলতি ছিল না। শিক্ষার্থীরা দাবি করতেই পারেন। কিন্তু দাবির মুখে আমরা ব্যবস্থা নিতে পারি না। সময় হলে আমরা নতুন ডিএসডব্লিউ নিয়োগ দেব। মধ্যরাতে ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের প্রবেশ নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে আমরা কারণ দর্শানোর নোটিস দেব যে, কেন তিনি ঢুকতে দিলেন। তার তো ঢুকতে দেওয়া উচিত হয়নি।

 

 

 

গভীর রাতে কেউ (ক্যাম্পাসে) ঢুকলে এটা অবশ্যই অমানবিক বা অনিয়মতান্ত্রিক। কে ঢুকেছে, তাকে তো আগে চিহ্নিত করতে হবে। চিহ্নিত না করে তো শাস্তি দেওয়া যাবে না। তার জন্য সময় প্রয়োজন। যদি কোনো নিরাপত্তারক্ষী বহিরাগত ব্যক্তিদের ঢুকতে দিয়ে থাকেন, তার বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা নেব।

 

 

 

বুয়েটে নিষিদ্ধ সংগঠন স্বার্থ হাসিল করছে: বুয়েট সাধারণ শিক্ষার্থীদের ‘আবেগকে’ ব্যবহার করে ‘নিষিদ্ধ সংগঠন’ স্বার্থ হাসিল করছে বলে অভিযোগ করেছেন প্রতিষ্ঠানটির কয়েকজন শিক্ষার্থী। গতকাল বিকাল ৩টায় বুয়েটের শহীদ মিনারের সামনে সংবাদ সম্মেলন করে এই অভিযোগ করে ২০ ব্যাচের শিক্ষার্থী তানভীর মাহমুদ স্বপ্নীল, আশিক আলম, সাগর বিশ্বাস, অরিত্র ঘোষ ও ২১ ব্যাচের অর্ঘ দাসরা। আরও ২০-২৫ জন উপস্থিত হওয়ার ইচ্ছা থাকলেও ‘বুলিংয়ের’ ভয়ে তারা অংশ নেননি বলে এই শিক্ষার্থীরা দাবি করেন। একইসঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্য করে অন্যান্য শিক্ষার্থীদের ‘বুলিংয়ের’ কিছু স্ক্রিনশট সাংবাদিকদের দেখান।

 

 

এদিকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা জানান, ছবি ও ভিডিও ফুটেজের মাধ্যমে ছাত্রলীগের প্রবেশে সহায়তা করা একাংশের ছবি চিহ্নিত করেছেন বলে দাবি করেছেন শিক্ষার্থীরা। তারা হলেন- বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের এএসএম আনাস ফেরদৌস, ইলেক্ট্রিকাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের মোহাম্মদ হাসিন আরমান নিহাল, অনিরুদ্ধ মজুমদার, সায়েম মাহমুদ সাজেদিন রিফাত এবং নেভাল আর্কিটেকচার অ্যান্ড মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের জাহিরুল ইসলাম ইমন। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম ভাঙায় এই শিক্ষার্থীদেরও বুয়েট থেকে স্থায়ী একাডেমিক এবং হল থেকে বহিষ্কার করতে হবে এবং জড়িত অন্যদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনা হবে। বহিরাগতদের প্রবেশকারীদের বিষয়ে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে কিনা মর্মে প্রশাসন থেকে লিখিত বিজ্ঞপ্তি দেওয়া ও তা বাস্তবায়ন করা।

 

 

দায়িত্ব পালনে অবহেলা করায় ছাত্রকল্যাণ পরিদপ্তরের পরিচালকের পদত্যাগ, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে কোনো হয়রানিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে না মর্মে লিখিত প্রতিশ্রুতি দেওয়া। আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা বলেন, আমাদের আন্দোলনের পর ‘তথাকথিত’ রাজনৈতিক সংগঠনের কিছু ব্যক্তিরা ফেসবুকে পোস্ট করে আন্দোলনের উদ্দেশ্য নিয়ে অপপ্রচার চালিয়েছেন। আমরা তাদের এমন বক্তব্যের ধিক্কার জানাই। তারা বলেন, আমরা সবসময়ই বুয়েটের নীতিমালায় থাকা ‘বুয়েটে সকল রকম ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ’ আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। আমাদের দাবি কোনো বিশেষ ছাত্র সংগঠনের বিরুদ্ধে না। আমরা যেকোনো মূল্যে বুয়েটকে ছাত্ররাজনীতির হাত থেকে মুক্ত রাখতে বদ্ধ পরিকল্প। উপস্থিত শিক্ষার্থীদের গণস্বাক্ষর নিয়ে আবেদনপত্র জমা দিয়েছি। এখনো আমাদের দাবি বাস্তবায়ন হয়নি। আমাদের কয়েকজন শিক্ষার্থী প্রচণ্ড গরমে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তাই আজকের মতো (শনিবার) আন্দোলন স্থগিত করছি।