১০:২৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৯ জানুয়ারী ২০২৬, ২৬ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ইসরায়েলকে কঠোর হুঁশিয়ারি চার দেশের

  • ইরানের ভূগর্ভস্থ পরমাণু কেন্দ্র ধ্বংসের সক্ষমতা ইসরায়েলের নেই : ট্রাম্প
  •  ইরান কখনোই পরমাণু অস্ত্র অর্জন করতে পারবে না : ফরাসি প্রেসিডেন্ট
  • শান্তির পথে সবচেয়ে বড় বাধা নেতানিয়াহু সরকার : এরদোয়ান
  • ইসরায়েলের হামলায় ইরানের আরও ২ কমান্ডার নিহত
  • বছরখানেক আগে থেকেই ইরানে হামলার প্রস্তুতি নেয় ইসরায়েল
  • ‘ইসরায়েল সন্ত্রাস ছড়াচ্ছে’ জাতিসংঘে মুখ ফসকে বললেন মার্কিন দূত
  • জাতিসংঘে ইসরায়েলকে তুলোধুনো করল পাকিস্তান, চীন, রাশিয়া ও আলজেরিয়া
  • যুদ্ধে জড়ানো হবে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ভয়ংকর ভুল’ : সাবেক সিআইএ প্রধান
  • ইরান আলোচনা এগিয়ে নিতে ইচ্ছুক : ফ্রান্স
  • আলোচনা ‘গঠনমূলক’ হয়েছে : যুক্তরাজ্য
  • উপেক্ষা ও অসম্মান দেখিয়ে হামলা করছে ইসরায়েল : জাতিসংঘে রাশিয়া

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। সম্প্রতি ইরানের ওপর ইসরায়েলের সামরিক হামলার ঘটনায় জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠকে পাকিস্তান, চীন, রাশিয়া ও আলজেরিয়া ইসরায়েলকে কঠোরভাবে সমালোচনা করেছে। এই দেশগুলো হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে জানিয়েছে, ইরানের ওপর হামলা পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতাকে মারাত্মকভাবে বিপন্ন করতে পারে। এই চারটি দেশ হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছে, ইরানের ওপর এই হামলা পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। গতকাল শনিবার এই তথ্য জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ড। তারা সতর্ক করে বলেছে, এই হামলা পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে এবং পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার যে নজির তৈরি করা হয়েছে তা ভবিষ্যতের জন্য বিপজ্জনক।
মূলত এই চারটি দেশের অনুরোধেই জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত ভ্যাসিলি নেবেনজিয়া বলেন, ইরানের শান্তিপূর্ণ বেসামরিক পারমাণবিক স্থাপনাগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু বানানো হচ্ছে। এতে ভয়াবহ পারমাণবিক বিপর্যয়ের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এমন স্থাপনায় হামলা চালানো যায় না। এসময় চীনের রাষ্ট্রদূত ফু কং বলেন, ইসরায়েলের এই হামলা আন্তর্জাতিক আইন ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নিয়ম লঙ্ঘন করেছে। এটি ইরানের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তাকেও ক্ষুণ্ন করছে এবং গোটা অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতা বিপন্ন করছে। পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত আসিম ইফতিখার আহমদ বলেন, ইসরায়েলের প্রকাশ্য সামরিক আগ্রাসন ও হামলাগুলোকে আমরা নিঃসন্দেহে নিন্দা জানাচ্ছি। এটি কেবল একটি দেশের জন্য নয়, গোটা অঞ্চলের ও বিশ্বশান্তির জন্যও গভীর হুমকি। আলজেরিয়ার রাষ্ট্রদূত আমার বেনদজামা এই হামলাকে বলেন, বিনা উসকানিতে ও অযৌক্তিকভাবে চালানো এই হামলা জাতিসংঘ সনদের প্রকাশ্য লঙ্ঘন।
ইরানের ভূগর্ভস্থ ফোর্দো পরমাণু কেন্দ্র ধ্বংস করার সক্ষমতা ইসরায়েলের নেই বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত শুক্রবার বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় এমন মন্তব্য করে তিনি বলেন, সত্যি ইসরায়েলের সক্ষমতা খুবই সীমিত। তারা হয়ত ফোর্দোর ছোট একটি ধ্বংস ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারবে। কিন্তু তারা অনেক নিচে যেতে পারবে না। তাদের সক্ষমতা নেই। তবে এটির প্রয়োজনীয়তা সম্ভবত হবে না। এদিকে ইরানের ফর্দো পরমাণু কেন্দ্রটি মাটির প্রায় ২৬২ মিটার নিচে অবস্থিত। এই কেন্দ্রটি ধ্বংস করতে শক্তিশালী বাঙ্কার বাস্টার বোমার প্রয়োজন হবে। যেটি শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের কাছেই আছে। ইরান তাদের কিছু পারমাণবিক উপকরণ গোপনে সরিয়ে ফেলেছে এবং সেগুলো এমন স্থানে সরিয়ে নিয়েছে যেখানে তা ধ্বংস করা কঠিন এমনটাই দাবি করেছে মার্কিনভিত্তিক পর্যবেক্ষক সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার (আইএসডব্লিউ) ও ক্রিটিক্যাল থ্রেটস প্রজেক্ট (সিটিপি)।
এদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের কাছ থেকে ফোন কল পাওয়ার কথা জানিয়েছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। এর আগে ম্যাক্রোঁ জানিয়েছিলেন, ইউরোপ ও ইরানের মধ্যে পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা ত্বরান্বিত করতে রাজি আছেন তিনি। সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ দেয়া একটি পোস্টে তিনি জানান, আমি দাবি করছি ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করবে না এবং এর উদ্দেশ্য শান্তিপূর্ণ কিনা সে নিশ্চয়তাও তাদেরকেই দিতে হবে। সংঘাত বন্ধ করে বড় বিপদ এড়ানোর অবশ্যই উপায় আছে।
অন্যদিকে ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) শীর্ষ সম্মেলনে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান বলেছেন, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনঞ্জামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন সরকারই এই অঞ্চলের শান্তির পথে সবচেয়ে বড় বাধা। নেতানিয়াহু সরকার একের পর এক আক্রমণ ও উসকানিমূলক পদক্ষেপ নিয়ে গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থিতিশীল করে তুলছে। ইরান, গাজা এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য অঞ্চলে ইসরায়েলের হামলা অস্থিরতা আরও বাড়িয়ে তুলছে। সম্প্রতি ইরানের ওপর ইসরায়েলের হামলার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে চলমান পারমাণবিক আলোচনা ভণ্ডুল করে দেওয়া।
আবার এদিকে ইসরায়েল আগে থেকেই ইরানের ওপর হামলার পরিকল্পনা করছিল বলে জানিয়েছেন ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর প্রধান ইয়াল জামির। তিনি বলেন, তারা ইরানের ওপর হামলার জন্য বছরখানেক আগে থেকেই প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। সাম্প্রতিক মাসগুলোয় এই প্রস্তুতির বিষয়ে সব তথ্য যতটা সম্ভব গোপন রাখা হয়েছে। জামির বিস্তারিত তথ্য না জানিয়েই বলেছেন, এই অভিযান সম্ভব হয়েছে অপারেশনাল ও কৌশলগত পরিস্থিতির কারণে। দেরি করলে পরিস্থিতি হারানোর ঝুঁকি ছিল এবং ইসরায়েল দুর্বল অবস্থায় পড়তে পারতো।
এদিকে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের এক জরুরি বৈঠকে ইরানের ওপর সামরিক আগ্রাসন নিয়ে ইসরায়েলের সমালোচনা করেছে পাকিস্তান, চীন, রাশিয়া ও আলজেরিয়া। এই চারটি দেশ হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছে, ইরানের ওপর এই হামলা পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। তারা সতর্ক করে বলেছে, এই হামলা পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে এবং পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার যে নজির তৈরি করা হয়েছে তা ভবিষ্যতের জন্য বিপজ্জনক।
এছাড়াও একই বৈঠকে জাতিসংঘে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের দূত ডরোথি শে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ‘সন্ত্রাস ছড়ানোর’ অভিযোগ তুলেছেন। পরে অবশ্য সঙ্গে সঙ্গেই নিজ বক্তব্য সংশোধন করেন তিনি। এর পরক্ষণেই তিনি বলেন, এই সংঘাতের জন্য ইরান দায়ী। অন্যদিকে ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যঁ-নোয়েল ব্যারো বলেছেন, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি পারমাণবিক কর্মসূচি ও অন্যান্য সব বিষয় নিয়েই আলোচনা এগিয়ে নিতে ইচ্ছুক থাকার ইঙ্গিত দিয়েছেন। ওদিকে যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি বলেছেন, আজ আমরা গঠনমূলক আলোচনা করেছি এবং তা চালিয়ে যাব। শুক্রবার সুইজারল্যান্ডের জেনিভায় ইরানের সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এমন কথাই বলেছেন দুই ইউরোপীয় দেশের দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমরা আশা করি ইরান খোলামেলা আলোচনা করবে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও আলোচনা করবে, যাতে সংলাপের মধ্য দিয়ে সংকটের একটি সমাধানে পৌঁছানো যায়। এই সংকট কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয় বরং ইউরোপের জন্যও গুরুতর ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে উল্লেখ করে ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তারা মনে করেন না যে, সামরিক পন্থায় ইরানের পারমাণবিক সমস্যার নিশ্চিত কোনো সমাধান আসবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আঞ্চলিক উত্তেজনা কারও জন্যই মঙ্গলজনক নয়। এজন্য আলোচনার পথ খোলা রাখা জরুরি। ইউরোপীয় কমিশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট কায়া কাল্লাস বলেছেন, বৈঠকে আমরা পারমাণবিক কর্মসূচি ছাড়াও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও আলোচনা চালিয়ে যেতে একমত হয়েছি। বৈঠক শেষে যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি বলেন, আমরা স্পষ্ট করে দিয়েছি, ইরানের হাতে পরমাণু অস্ত্র থাকতে পারবে না। তবে কূটনৈতিক পন্থায় সমাধানে আসতে আলোচনা চালিয়ে যেতে তিনি ও তাদের মিত্র ইউরোপীয় দেশগুলোও আগ্রহী বলে জানান ল্যামি। তিনি বলেন, আমরা চাই ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রাখুক। এটা একটি বিপজ্জনক মুহূর্ত। আমরা যাতে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সংঘাত অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে না দেখি, সেটি ভীষণভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ওদিকে বৈঠকের পর জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইওহান ভাদেফুল বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা যেন আর না বাড়ে সেটি নিশ্চিত করাই আমাদের সম্মিলিত লক্ষ্য। পাশাপাশি আলোচনার মাধ্যমে যেন অগ্রগতি হয়, তাও আমরা নিশ্চিত করব। বৈঠক শেষে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি তার আগের অবস্থানই পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, আগ্রাসন একবার বন্ধ হলেই ইরান আবার কূটনৈতিক পথের বিষয়টি বিবেচনা করতে প্রস্তুত। ঘৃণ্য অপরাধ সংঘটনের জন্য আগ্রাসনকারীর জবাবদিহিতাও দাবি করেন তিনি।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ দাবি করে আরাগচি বলেন, এর ওপর (পারমাণবিক স্থাপনা) হামলা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। ইরান নিজেদের প্রতিরক্ষা চালিয়ে যাবে। এটি তাদের বৈধ অধিকার। ইরানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আলোচনার বিষয় নয় বলেও স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন আরাগচি।
ইরানে আক্রমণ করলে যুক্তরাষ্ট্র একটি আঞ্চলিক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই এমন সতর্কবার্তা দিয়েছেন মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর সাবেক পরিচালক লিওন প্যানেটা। গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক প্রধান বলেছেন, দুই দশক আগে ইরাকে হামলা করে যুক্তরাষ্ট্র ‘ভয়ংকর ভুল’ করেছিল। ওই আক্রমণ কয়েক বছর ধরে স্থায়ী একটি যুদ্ধের সূচনা করেছিল। প্যানেটা সিএনএনকে বলেন, এটি এমন একটি শিক্ষা, যা প্রেসিডেন্টের শেখা উচিত, কারণ তিনি যদি ইরানে হামলা করেন তাহলে নিঃসন্দেহে যুক্তরাষ্ট্র তখন একটি আঞ্চলিক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে। প্যানেটা একসময় প্রতিরক্ষামন্ত্রীও ছিলেন। তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন, ইরান পাল্টা জবাব দিতে বাধ্য। তিনি বলেন, সুতরাং ভুল বুঝবেন না। এটি একটি মাত্র বিমান হামলা হতে পারে, তবে এটি অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

ছাত্র সংসদে ভোটের ফল জাতীয় নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে না: মির্জা ফখরুল

ইসরায়েলকে কঠোর হুঁশিয়ারি চার দেশের

আপডেট সময় : ০৮:২৫:২৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২২ জুন ২০২৫
  • ইরানের ভূগর্ভস্থ পরমাণু কেন্দ্র ধ্বংসের সক্ষমতা ইসরায়েলের নেই : ট্রাম্প
  •  ইরান কখনোই পরমাণু অস্ত্র অর্জন করতে পারবে না : ফরাসি প্রেসিডেন্ট
  • শান্তির পথে সবচেয়ে বড় বাধা নেতানিয়াহু সরকার : এরদোয়ান
  • ইসরায়েলের হামলায় ইরানের আরও ২ কমান্ডার নিহত
  • বছরখানেক আগে থেকেই ইরানে হামলার প্রস্তুতি নেয় ইসরায়েল
  • ‘ইসরায়েল সন্ত্রাস ছড়াচ্ছে’ জাতিসংঘে মুখ ফসকে বললেন মার্কিন দূত
  • জাতিসংঘে ইসরায়েলকে তুলোধুনো করল পাকিস্তান, চীন, রাশিয়া ও আলজেরিয়া
  • যুদ্ধে জড়ানো হবে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ভয়ংকর ভুল’ : সাবেক সিআইএ প্রধান
  • ইরান আলোচনা এগিয়ে নিতে ইচ্ছুক : ফ্রান্স
  • আলোচনা ‘গঠনমূলক’ হয়েছে : যুক্তরাজ্য
  • উপেক্ষা ও অসম্মান দেখিয়ে হামলা করছে ইসরায়েল : জাতিসংঘে রাশিয়া

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। সম্প্রতি ইরানের ওপর ইসরায়েলের সামরিক হামলার ঘটনায় জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠকে পাকিস্তান, চীন, রাশিয়া ও আলজেরিয়া ইসরায়েলকে কঠোরভাবে সমালোচনা করেছে। এই দেশগুলো হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে জানিয়েছে, ইরানের ওপর হামলা পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতাকে মারাত্মকভাবে বিপন্ন করতে পারে। এই চারটি দেশ হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছে, ইরানের ওপর এই হামলা পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। গতকাল শনিবার এই তথ্য জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ড। তারা সতর্ক করে বলেছে, এই হামলা পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে এবং পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার যে নজির তৈরি করা হয়েছে তা ভবিষ্যতের জন্য বিপজ্জনক।
মূলত এই চারটি দেশের অনুরোধেই জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত ভ্যাসিলি নেবেনজিয়া বলেন, ইরানের শান্তিপূর্ণ বেসামরিক পারমাণবিক স্থাপনাগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু বানানো হচ্ছে। এতে ভয়াবহ পারমাণবিক বিপর্যয়ের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এমন স্থাপনায় হামলা চালানো যায় না। এসময় চীনের রাষ্ট্রদূত ফু কং বলেন, ইসরায়েলের এই হামলা আন্তর্জাতিক আইন ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নিয়ম লঙ্ঘন করেছে। এটি ইরানের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তাকেও ক্ষুণ্ন করছে এবং গোটা অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতা বিপন্ন করছে। পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত আসিম ইফতিখার আহমদ বলেন, ইসরায়েলের প্রকাশ্য সামরিক আগ্রাসন ও হামলাগুলোকে আমরা নিঃসন্দেহে নিন্দা জানাচ্ছি। এটি কেবল একটি দেশের জন্য নয়, গোটা অঞ্চলের ও বিশ্বশান্তির জন্যও গভীর হুমকি। আলজেরিয়ার রাষ্ট্রদূত আমার বেনদজামা এই হামলাকে বলেন, বিনা উসকানিতে ও অযৌক্তিকভাবে চালানো এই হামলা জাতিসংঘ সনদের প্রকাশ্য লঙ্ঘন।
ইরানের ভূগর্ভস্থ ফোর্দো পরমাণু কেন্দ্র ধ্বংস করার সক্ষমতা ইসরায়েলের নেই বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত শুক্রবার বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় এমন মন্তব্য করে তিনি বলেন, সত্যি ইসরায়েলের সক্ষমতা খুবই সীমিত। তারা হয়ত ফোর্দোর ছোট একটি ধ্বংস ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারবে। কিন্তু তারা অনেক নিচে যেতে পারবে না। তাদের সক্ষমতা নেই। তবে এটির প্রয়োজনীয়তা সম্ভবত হবে না। এদিকে ইরানের ফর্দো পরমাণু কেন্দ্রটি মাটির প্রায় ২৬২ মিটার নিচে অবস্থিত। এই কেন্দ্রটি ধ্বংস করতে শক্তিশালী বাঙ্কার বাস্টার বোমার প্রয়োজন হবে। যেটি শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের কাছেই আছে। ইরান তাদের কিছু পারমাণবিক উপকরণ গোপনে সরিয়ে ফেলেছে এবং সেগুলো এমন স্থানে সরিয়ে নিয়েছে যেখানে তা ধ্বংস করা কঠিন এমনটাই দাবি করেছে মার্কিনভিত্তিক পর্যবেক্ষক সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার (আইএসডব্লিউ) ও ক্রিটিক্যাল থ্রেটস প্রজেক্ট (সিটিপি)।
এদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের কাছ থেকে ফোন কল পাওয়ার কথা জানিয়েছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। এর আগে ম্যাক্রোঁ জানিয়েছিলেন, ইউরোপ ও ইরানের মধ্যে পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা ত্বরান্বিত করতে রাজি আছেন তিনি। সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ দেয়া একটি পোস্টে তিনি জানান, আমি দাবি করছি ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করবে না এবং এর উদ্দেশ্য শান্তিপূর্ণ কিনা সে নিশ্চয়তাও তাদেরকেই দিতে হবে। সংঘাত বন্ধ করে বড় বিপদ এড়ানোর অবশ্যই উপায় আছে।
অন্যদিকে ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) শীর্ষ সম্মেলনে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান বলেছেন, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনঞ্জামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন সরকারই এই অঞ্চলের শান্তির পথে সবচেয়ে বড় বাধা। নেতানিয়াহু সরকার একের পর এক আক্রমণ ও উসকানিমূলক পদক্ষেপ নিয়ে গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থিতিশীল করে তুলছে। ইরান, গাজা এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য অঞ্চলে ইসরায়েলের হামলা অস্থিরতা আরও বাড়িয়ে তুলছে। সম্প্রতি ইরানের ওপর ইসরায়েলের হামলার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে চলমান পারমাণবিক আলোচনা ভণ্ডুল করে দেওয়া।
আবার এদিকে ইসরায়েল আগে থেকেই ইরানের ওপর হামলার পরিকল্পনা করছিল বলে জানিয়েছেন ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর প্রধান ইয়াল জামির। তিনি বলেন, তারা ইরানের ওপর হামলার জন্য বছরখানেক আগে থেকেই প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। সাম্প্রতিক মাসগুলোয় এই প্রস্তুতির বিষয়ে সব তথ্য যতটা সম্ভব গোপন রাখা হয়েছে। জামির বিস্তারিত তথ্য না জানিয়েই বলেছেন, এই অভিযান সম্ভব হয়েছে অপারেশনাল ও কৌশলগত পরিস্থিতির কারণে। দেরি করলে পরিস্থিতি হারানোর ঝুঁকি ছিল এবং ইসরায়েল দুর্বল অবস্থায় পড়তে পারতো।
এদিকে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের এক জরুরি বৈঠকে ইরানের ওপর সামরিক আগ্রাসন নিয়ে ইসরায়েলের সমালোচনা করেছে পাকিস্তান, চীন, রাশিয়া ও আলজেরিয়া। এই চারটি দেশ হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছে, ইরানের ওপর এই হামলা পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। তারা সতর্ক করে বলেছে, এই হামলা পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে এবং পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার যে নজির তৈরি করা হয়েছে তা ভবিষ্যতের জন্য বিপজ্জনক।
এছাড়াও একই বৈঠকে জাতিসংঘে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের দূত ডরোথি শে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ‘সন্ত্রাস ছড়ানোর’ অভিযোগ তুলেছেন। পরে অবশ্য সঙ্গে সঙ্গেই নিজ বক্তব্য সংশোধন করেন তিনি। এর পরক্ষণেই তিনি বলেন, এই সংঘাতের জন্য ইরান দায়ী। অন্যদিকে ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যঁ-নোয়েল ব্যারো বলেছেন, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি পারমাণবিক কর্মসূচি ও অন্যান্য সব বিষয় নিয়েই আলোচনা এগিয়ে নিতে ইচ্ছুক থাকার ইঙ্গিত দিয়েছেন। ওদিকে যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি বলেছেন, আজ আমরা গঠনমূলক আলোচনা করেছি এবং তা চালিয়ে যাব। শুক্রবার সুইজারল্যান্ডের জেনিভায় ইরানের সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এমন কথাই বলেছেন দুই ইউরোপীয় দেশের দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমরা আশা করি ইরান খোলামেলা আলোচনা করবে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও আলোচনা করবে, যাতে সংলাপের মধ্য দিয়ে সংকটের একটি সমাধানে পৌঁছানো যায়। এই সংকট কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয় বরং ইউরোপের জন্যও গুরুতর ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে উল্লেখ করে ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তারা মনে করেন না যে, সামরিক পন্থায় ইরানের পারমাণবিক সমস্যার নিশ্চিত কোনো সমাধান আসবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আঞ্চলিক উত্তেজনা কারও জন্যই মঙ্গলজনক নয়। এজন্য আলোচনার পথ খোলা রাখা জরুরি। ইউরোপীয় কমিশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট কায়া কাল্লাস বলেছেন, বৈঠকে আমরা পারমাণবিক কর্মসূচি ছাড়াও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও আলোচনা চালিয়ে যেতে একমত হয়েছি। বৈঠক শেষে যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি বলেন, আমরা স্পষ্ট করে দিয়েছি, ইরানের হাতে পরমাণু অস্ত্র থাকতে পারবে না। তবে কূটনৈতিক পন্থায় সমাধানে আসতে আলোচনা চালিয়ে যেতে তিনি ও তাদের মিত্র ইউরোপীয় দেশগুলোও আগ্রহী বলে জানান ল্যামি। তিনি বলেন, আমরা চাই ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রাখুক। এটা একটি বিপজ্জনক মুহূর্ত। আমরা যাতে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সংঘাত অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে না দেখি, সেটি ভীষণভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ওদিকে বৈঠকের পর জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইওহান ভাদেফুল বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা যেন আর না বাড়ে সেটি নিশ্চিত করাই আমাদের সম্মিলিত লক্ষ্য। পাশাপাশি আলোচনার মাধ্যমে যেন অগ্রগতি হয়, তাও আমরা নিশ্চিত করব। বৈঠক শেষে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি তার আগের অবস্থানই পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, আগ্রাসন একবার বন্ধ হলেই ইরান আবার কূটনৈতিক পথের বিষয়টি বিবেচনা করতে প্রস্তুত। ঘৃণ্য অপরাধ সংঘটনের জন্য আগ্রাসনকারীর জবাবদিহিতাও দাবি করেন তিনি।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ দাবি করে আরাগচি বলেন, এর ওপর (পারমাণবিক স্থাপনা) হামলা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। ইরান নিজেদের প্রতিরক্ষা চালিয়ে যাবে। এটি তাদের বৈধ অধিকার। ইরানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আলোচনার বিষয় নয় বলেও স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন আরাগচি।
ইরানে আক্রমণ করলে যুক্তরাষ্ট্র একটি আঞ্চলিক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই এমন সতর্কবার্তা দিয়েছেন মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর সাবেক পরিচালক লিওন প্যানেটা। গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক প্রধান বলেছেন, দুই দশক আগে ইরাকে হামলা করে যুক্তরাষ্ট্র ‘ভয়ংকর ভুল’ করেছিল। ওই আক্রমণ কয়েক বছর ধরে স্থায়ী একটি যুদ্ধের সূচনা করেছিল। প্যানেটা সিএনএনকে বলেন, এটি এমন একটি শিক্ষা, যা প্রেসিডেন্টের শেখা উচিত, কারণ তিনি যদি ইরানে হামলা করেন তাহলে নিঃসন্দেহে যুক্তরাষ্ট্র তখন একটি আঞ্চলিক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে। প্যানেটা একসময় প্রতিরক্ষামন্ত্রীও ছিলেন। তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন, ইরান পাল্টা জবাব দিতে বাধ্য। তিনি বলেন, সুতরাং ভুল বুঝবেন না। এটি একটি মাত্র বিমান হামলা হতে পারে, তবে এটি অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলবে।