১০:৩৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৩ মার্চ ২০২৪, ২০ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

ভারোত্তোলনে ভবিষ্যৎ শাম্মি

১২ বাই ১২ কিংবা ১৪ বাই ১৪ রুম হবে। আলো বাতাসের কোনো সুযোগ নেই। দরজা দিয়ে যতটুকু বাতাস ঢুকে তাতেই চলে ভারোত্তোলনের কার্যক্রম। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের ভাষায় এটি জিমন্যাশিয়াম। আধুনিক লজিস্টিক সাপোর্ট ছাড়াই অনুশীলন করে যাচ্ছেন ভারোত্তোলকরা। নানা রকম অসুবিধায় থেকেও এই ঘুপরি রুম থেকেই বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বর্ণপদক এনে দিয়েছেন মাবিয়া আক্তার সীমান্ত।

আরো অনেক জাতীয় চ্যাম্পিয়নের পথচলা এখান থেকেই। বাংলাদেশের হয়ে পাঁচ গোল্ড মেডেলিস্ট ভারোত্তোলক হামিদুল ইসলাম (২০১০ সাউথ এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ), মোল্লা সাবিরা সুলতানা (২০১২ সাউথ এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ), শাহরিয়া সুলতানা সুচী (২০১২ সাউথ এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ), মাবিয়া আক্তার সীমান্ত (২০১৫ কমনওয়েলথ চ্যাম্পিয়নশিপ, ২০১৬ সাউথ এশিয়ান গেমস ও ২০১৬ এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ) ও জোহরা আক্তার রেশমার (২০১৬ এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ)।

গত তিন বছর যাবত অনুষ্ঠিত হচ্ছে বঙ্গবন্ধু ইয়ুথ (অ-১৭) জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ। তাক লাগিয়েছেন জাতীয় ভারোত্তোলনে ১৪ বার চ্যাম্পিয়ন হওয়া, রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত জাতীয় দলের কোচ শাহরিয়া সুলতানার কন্যা শাম্মি সুলতানা। তিনটি রেকর্ড গড়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। যা বাংলাদেশের জুনিয়র পর্যায়ে প্রথম। এখন থেকেই তাকে ধরা হচ্ছে ভারোত্তোলনে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ হিসেবে।

পুরস্কার প্রদান মঞ্চেও ছিল ব্যাতিক্রম। বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে এই প্রথম দেখা গেল কেউ তার নানীর হাত থেকে পদক নিচ্ছে। বালিকা বিভাগে ৫৯ কেজিতে প্রথম হওয়া শাম্মি সুলতানাকে পদক পরিয়ে দেন তার নানী রিজিয়া বেগম। সাথে ছিলেন রিজিয়া বেগমের মেয়ে শাহরিয়া সুলতানাও।

ভারত্তোলন অঙ্গনে অত্যন্ত পরিচিত মুখ শাহরিয়া সুলতানা। তারকা ভারত্তোলকের মেয়ে শাম্মিও দ্যুতি ছড়াচ্ছেন ভারত্তোলনে। জুনিয়র প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছেন কয়েকবার। চলমান ইয়ুথ প্রতিযোগিতায় নারী বিভাগে সেরা ভারত্তোলকের পুরস্কারও পেয়েছেন। তার সেরা হওয়ার কারণ ক্লিন অ্যান্ড জার্ক, স্ন্যাচ ও মোট মিলিয়ে তিনটিতেই রেকর্ড।

কয়েক মাস আগে পেয়েছিলেন নারী ক্লাব প্রতিযোগিতার সেরার খেতাব। চার মাসের মধ্যে দুইবার সেরা পুরস্কার পেয়ে মাকে খানিকটা হুঙ্কার দিলেন নড়াইলের আব্দুর রাজ্জাক শরীর চর্চা ক্লাবের হয়ে খেলা শাম্মি, ‘কয়েক মাসের ব্যবধানে দুইবার সেরা খেলোয়াড়ের স্বীকৃতি পেলাম। এই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে মাকে ছাড়িয়ে যেতে চাই।’

মা শাহরিয়া সুলতানা আদরমাখা সুরেই বললেন, ‘এরই মধ্যে তুমি আমাকে ছাড়িয়েই গেছ। আমি ভারত্তোলন শুরু করেছি অনেক পরে আর জুনিয়রে আমি এত সেরাও হইনি। আগামী মার্চে সিনিয়র জাতীয় প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে। ঐ প্রতিযোগিতায় ভালো কিছু করতে হলে তাকে সেভাবেই প্রস্তুত হতে হবে। ভালো পারফরম্যান্স ধারাবাহিকতা বজায় রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ।’

অন্যান্য খেলার প্রতি কখানো ইচ্ছাই জাগেনি শাম্মির। আর ইচ্ছা জাগবেই বা কিভাবে, সে যখন আরো ছোট তখন তার মাকে ক্রীড়া পরিষদের ট্যালেন্ট হান্ট প্রোগ্রামে বিভিন্ন জেলায় যেতে হতো কোচ হিসেবে। তখন ছোট্ট শাম্মিও মায়ের আঁচল ধরে থাকতে হতো মায়ের সাথে সাথেই। তখন থেকেই ভারোত্তোলনে হাতে খড়ি শাম্মির। স্কেল, বেত, লাঠি, কলম দিয়ে হতো তার প্রাথমিক ট্রেনিং। যখন আর একটু বড় হলো তখন নানাবাড়ি গিয়ে ঘটলো মজার ঘটনা। শাম্মির মুখেই শুনা যাক-ওখানে কিছু ছিল না। নানা-নানুকে তো দেখাতে হবে, আমি ওয়েট লিফটিং করতে পারি। অগত্যা ঘরের পর্দার স্টিক খুলে কোলবালিশকে বেঁধে ওয়েট লিফটিং করেছিলাম। সে কথা মনে হলে এখনো হাসি পায়।’

উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী শাম্মি আক্তার। পড়ালেখায়ও ভালো। নিজ ক্লাশে সেরা দশে থাকে। পড়ালেখার ফাঁকে কিংবা পরে যখন অন্যান্য বান্ধবীরা নানারকম সামাজিক মাধ্যমে লেগে থাকে চ্যাট করে তখন আমি ভারোত্তোলন নিয়ে ব্যস্ত থাকি। রাতে আবার স্কুলের হোমওয়ার্কও করি। বান্ধবীরা অনেক সময় আশ্চর্য হয় এত ভার উঠিয়ে ক্লান্ত হই না কেন। তাদেরকে বলি এটাই আমার প্যশন। ভারোত্তোলন নিয়ে আমি অনেক দূর যেতে চাই।’

প্রতিযোগিতায় ভার উঠিয়েই মাকে জড়িয়ে ধরেছিলেন শাম্মি। এমনটা নাকি তিনি ভাবেননি। হঠাৎই মনের অজান্তে হয়ে গেছে। তার কথায়, কি হয়েছে আমি তা বলতে পারব না। ঘোরের মাঝেই হয়েছে। কোনো পরিকল্পনা ছিল না। রেকর্ড হওয়ার পর কি কি করেছি মনে করতে পারছি না। তবে আম্মুর করা ভিডিওতে দেখেছি। আমার এই রেকর্ডে অনেকেই উৎসাহ দিয়েছেন। কেউ কেউ ভবিষ্যতের পথ নির্দেশনাও দিচ্ছেন।’

ছোটকাল থেকেই ভারোত্তোলনে আগ্রহী শাম্মি যখন আরো একটু বড় হলেন, বুঝতে শিখলেন, তখন থেকেই হাতেখড়ি হিসেবে মানতে চান। শুনালেন সে গল্পও। ‘করোনাকালীন সময়ে বিশ^ যখন স্তব্ধ। ঘরে বসে থাকাই ছিল প্রধান কাজ। কোনো কাজ কর্ম নেই। স্কুল নেই, কারো সঙ্গে মেলামেশা নেই, কিচ্ছু নেই। বোরিং হয়ে গিয়েছিলাম। মাকে বললাম, মা- চল ভারোত্তোলনে যাই। অনুশীলন করি। ভালো লাগবে। আমরা করোনা বিধি মেনেই কাজগুলো করতে পারি। আমার আকুতি মা শুনলেন এবং রাজি হলেন। বলতে পারেন তখন থেকেই ভারোত্তোলনে আমার হাতেখড়ি।’

নিজেকে কোথায় দেখতে চান, এমন প্রশ্নে খুব ছোট করেই উত্তর দিলেন শাম্মি। ‘আমি ভারোত্তোলনে সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলতে চাই। যেমন অলিম্পিক-ওয়ার্ল্ড কাপ ইত্যাদি। সে লক্ষ্যে নিজেকে প্রস্তত করতে চাই। সুস্থতা অতীব জরুরি। সেদিকেও খেয়াল রাখতে চাই।’

শাহরিয়া সুলতানা জানালেন অনেক অসঙ্গতির কথা। একজন ভারোত্তোলক নিজেকে গড়তে প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়। যতটুকু ক্যালরি ক্ষয় হয় তা পূরণ করতে না পারলে শরীরে নানারকম অসঙ্গতি দেখা দেয়। কতজন মেয়ে বা ছেলে পারে পর্যাপ্ত পুষ্টি গ্রহণ করতে। এটাও একটা দিক ভারোত্তোলক তৈরি না হওয়া। উচ্চবিত্তদের এগিয়ে আসতে হবে। তাহলেই আধুনিকায়ন হবে ভারোত্তোলন। উইং কমান্ডার মহিউদ্দিন সর্বজনবিদিত। তাকে সরানোর জন্য একটা মহল একসময় তৎপর ছিল। বিশ^ আসরে তখন মহিউদ্দিন ছাড়া অচল হয়ে পড়েছিল। দীর্ঘসময় পর মহিউদ্দিন ও সভাপতি নজরুল ইসলামে হাত ধরে ঘুরে দাঁড়ায় ভারোত্তোলন। সেনাবাহিনী, বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড, আনসার বাহিনী এখন অনেকটাই এগিয়ে এসেছে চাকরি দেওয়ার ক্ষেত্রে।

আনসার ও সেনাবাহিনীর খেলোয়াড়দের মাঝে চরম প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়। স্মৃতি আক্তার, মনিরা কাজী, তানিয়া খাতুন, মাবিয়া আক্তার সীমান্ত সবাই শাহরিয়ার স্টুডেন্ট। সেরা কোচ সেনাবাহিনীর শাহরিয়া সুলতানা সূচী জানান, ‘আপনি কিসের ভরসায় ভারোত্তোলন করবেন। এটাকে প্রফেশন হিসেবে নিতে না পারলে আপনার জীবন কাটবে কিভাবে। এগিয়ে এসেছে সেনাবাহিনী, বিজিবি, আনসারসহ অনেকেই। পারফর্ম করলেই মিলতে পারে চাকরি।’

মেয়েকে নিয়ে অনেক আশাবাদি শাহরিয়া সুলতানা। শুনালেন তার অতীত, ‘পারিপাশির্^কতা নিয়ে তো তার ভাবতে হবে না। তার একমাত্র কাজ হলো পড়ালেখার পাশাপাশি খেলাটাকে রপ্ত করা। আমার সময়ে ট্রাউজার টি-শার্ট পরাটা যেন ছিল অন্যায়। খেলাধুলা করা মেয়েগুলোকে দস্যি হিসেবে আখ্যা দেওয়া হতো। আড় চোখে দেখা হতো। সবাই এমনভাবে দেখতো, মনে হতো চিড়িয়াখানার কোনো জন্তু। সামাজিকভাবে হেয় চোখে তাকাতো। আমি কারো কথা শুনতাম না। গাছে উঠা, সাইকেল চালানো, মাঠে দৌড়ানো উপভোগ করতাম। সাহস পেয়েছিলাম বাবার কাছ থেকে। মা একটু বকাঝকা করলেও বাবা পূর্ণ সাপোর্ট দিয়েছেন। যে কারণে আজ আমি ভারোত্তোলনের শাহরিয়া। আমিও আমার মেয়েকে কোনোরকম বাধা দেই না। তবে হ্যাঁ শালীনতার মাঝে থেকেই তার এগিয়ে যেতে হবে। বড়দের শ্রদ্ধা আর ছোটদের স্নেহ করতে হবে। তার গুরুদের প্রতি শ্রদ্ধা থাকতে হবে আজীবন।’

শুধু শাম্মিই নয়, নতুন প্রজন্মে আরো কয়েকজন আছে যাদেরকে ভবিষ্যতের ভারোত্তোলক হিসেবে ধরা হচ্ছে। উপযুক্ত প্রশিক্ষণ পেলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তারাও ওড়াতে পারবে লাল-সবুজের পতাকা। বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন (বিওএ) আয়োজিত শেখ কামাল ২য় বাংলাদেশ যুব গেমসে ভারোত্তোলন ডিসিপ্লিনে রেকর্ড গড়ে স্বর্ণ জিতেছেন শাম্মী সুলতানা, মো. সোহান ও জয়দেব রায়।

তরুণী বিভাগে ৫৫ কেজি ওজন শ্রেণিতে খুলনা বিভাগের শাম্মী স্ন্যাচ ৫০* ও ক্লিন অ্যান্ড জার্ক ৬২* মিলিয়ে ১১২* কেজি উত্তোলন করে স্বর্ণ জিতেছেন। তরুণ বিভাগের ৬১ কেজি ওজন শ্রেণিতে খুলনা বিভাগের মো. সোহান স্ন্যাচ ৯২* ক্লিন অ্যান্ড জার্ক ৯৭* মিলিয়ে ১৮৭* তুলে স্বর্ণ, ৬৭ কেজি ওজন শ্রেণিতে রংপুর বিভাগের জয়দেব রায় স্ন্যাচ ৯০* ও ক্লিন অ্যান্ড জার্ক ১১৫* মিলিয়ে ২০৫* কেজি তুলে স্বর্ণ জিতেছেন। (*চিহ্ন রেকর্ড বুঝাচ্ছে)।

শাম্মি জানালেন, ‘অনুশীলনে আম্মু এতটুকুও ছাড় দেয় না। একটু ভুল হলেই রক্ষা নেই। এমনভাবে তাকায় যেন খেয়ে ফেলবে। তখন মনে হয় আম্মু অনেক কঠিন। আবার যখন আদর তখন আমার আম্মু বেস্ট মম।’

শাহরিয়া জানালেন, ‘আমার কাছে সব সমান। অনুশীলনে কিংবা ক্যাম্পে কোনো অনুকম্পা নয়। পারফর্ম করেই উপরে উঠতে হয়। অন্য কোনো রাস্তা অবলম্বন করা মানে নিজের সঙ্গে নিজের প্রতারণা। ওদের লেভেলে যারা আছে জয়দেব, সোহান কিংবা শাম্মি সবাইকে কঠোর পরিশ্রম করেই নিজের পথ তৈরি করতে হবে। ওরা সবাই রেকর্ডধারি। নিজেদের রেকর্ড নিজেরাই ভাঙছে। এটা আমাকে প্রেরণা দেয় তাদেরকে আরো ভালো প্রশিক্ষণ দেয়ার।’

জাতীয় পুরস্কারের যোগ্য কারা। এমন প্রশ্নই অনেকবার ঘুরপাক খায় জাতীয় পুরস্কার দেয়ার আগে। যোগ্যরা থেকে যান প্রচ্ছন্নে। অযোগ্যরা চলে আসে প্রচ্ছদে। সিলেকশন কমিটির কারো কারো দহরম মহরমে সুযোগ পায় অযোগ্যরা। আর সার্টিফিকেট ও মেডেল নিয়ে কাঁদেন সত্যিকারের পুরস্কারের যোগ্য খেলোয়াড়েরা। ২০১৮ সালে ভারোত্তোলনে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত দুই শ্রেষ্ঠ মহিলা ভারোত্তোলক মোল্লা সাবিরা ও শাহরিয়া সুলতানাকে বাদ দিয়ে জাতীয় পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছেন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্রোঞ্জপদক জয়ী জেসমিন আক্তার। অথচ তাদের তুলনায় যোজন যোজন পিছিয়ে জেসমিন। জেসমিন যে আসরে ব্রোঞ্জ পেয়েছে সেই আসরে স্বর্ণপদক পেয়েছেন সাবিরা ও শাহরিয়া।

শাহরিয়া জানালেন, ‘এটা কেমন সিস্টেম তা আমার জানা নেই। আমরা যে ঝড় ঝাপটার মাঝে দিয়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছি, তাতে একটা কথাই বলার আছে-পরবর্তী প্রজন্ম যেন এমন বাজে পরিস্থিতির শিকার না হয়। যেটা স্বাভাবিক-সুন্দর-দৃষ্টিকটু নয়-সমালোচনার বাইরে থাকে-এক বাক্যে যেন সবাই শিকার করে যে, যাকে পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে সে আসলেই যোগ্য। এটা শুধু ভারোত্তোলনেই নয়- হোক ক্রীড়ার সব শাখায়।’

 

 

স/মিফা

ভারোত্তোলনে ভবিষ্যৎ শাম্মি

আপডেট সময় : ১২:০৩:৪৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩১ জানুয়ারী ২০২৪

১২ বাই ১২ কিংবা ১৪ বাই ১৪ রুম হবে। আলো বাতাসের কোনো সুযোগ নেই। দরজা দিয়ে যতটুকু বাতাস ঢুকে তাতেই চলে ভারোত্তোলনের কার্যক্রম। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের ভাষায় এটি জিমন্যাশিয়াম। আধুনিক লজিস্টিক সাপোর্ট ছাড়াই অনুশীলন করে যাচ্ছেন ভারোত্তোলকরা। নানা রকম অসুবিধায় থেকেও এই ঘুপরি রুম থেকেই বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বর্ণপদক এনে দিয়েছেন মাবিয়া আক্তার সীমান্ত।

আরো অনেক জাতীয় চ্যাম্পিয়নের পথচলা এখান থেকেই। বাংলাদেশের হয়ে পাঁচ গোল্ড মেডেলিস্ট ভারোত্তোলক হামিদুল ইসলাম (২০১০ সাউথ এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ), মোল্লা সাবিরা সুলতানা (২০১২ সাউথ এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ), শাহরিয়া সুলতানা সুচী (২০১২ সাউথ এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ), মাবিয়া আক্তার সীমান্ত (২০১৫ কমনওয়েলথ চ্যাম্পিয়নশিপ, ২০১৬ সাউথ এশিয়ান গেমস ও ২০১৬ এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ) ও জোহরা আক্তার রেশমার (২০১৬ এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ)।

গত তিন বছর যাবত অনুষ্ঠিত হচ্ছে বঙ্গবন্ধু ইয়ুথ (অ-১৭) জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ। তাক লাগিয়েছেন জাতীয় ভারোত্তোলনে ১৪ বার চ্যাম্পিয়ন হওয়া, রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত জাতীয় দলের কোচ শাহরিয়া সুলতানার কন্যা শাম্মি সুলতানা। তিনটি রেকর্ড গড়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। যা বাংলাদেশের জুনিয়র পর্যায়ে প্রথম। এখন থেকেই তাকে ধরা হচ্ছে ভারোত্তোলনে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ হিসেবে।

পুরস্কার প্রদান মঞ্চেও ছিল ব্যাতিক্রম। বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে এই প্রথম দেখা গেল কেউ তার নানীর হাত থেকে পদক নিচ্ছে। বালিকা বিভাগে ৫৯ কেজিতে প্রথম হওয়া শাম্মি সুলতানাকে পদক পরিয়ে দেন তার নানী রিজিয়া বেগম। সাথে ছিলেন রিজিয়া বেগমের মেয়ে শাহরিয়া সুলতানাও।

ভারত্তোলন অঙ্গনে অত্যন্ত পরিচিত মুখ শাহরিয়া সুলতানা। তারকা ভারত্তোলকের মেয়ে শাম্মিও দ্যুতি ছড়াচ্ছেন ভারত্তোলনে। জুনিয়র প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছেন কয়েকবার। চলমান ইয়ুথ প্রতিযোগিতায় নারী বিভাগে সেরা ভারত্তোলকের পুরস্কারও পেয়েছেন। তার সেরা হওয়ার কারণ ক্লিন অ্যান্ড জার্ক, স্ন্যাচ ও মোট মিলিয়ে তিনটিতেই রেকর্ড।

কয়েক মাস আগে পেয়েছিলেন নারী ক্লাব প্রতিযোগিতার সেরার খেতাব। চার মাসের মধ্যে দুইবার সেরা পুরস্কার পেয়ে মাকে খানিকটা হুঙ্কার দিলেন নড়াইলের আব্দুর রাজ্জাক শরীর চর্চা ক্লাবের হয়ে খেলা শাম্মি, ‘কয়েক মাসের ব্যবধানে দুইবার সেরা খেলোয়াড়ের স্বীকৃতি পেলাম। এই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে মাকে ছাড়িয়ে যেতে চাই।’

মা শাহরিয়া সুলতানা আদরমাখা সুরেই বললেন, ‘এরই মধ্যে তুমি আমাকে ছাড়িয়েই গেছ। আমি ভারত্তোলন শুরু করেছি অনেক পরে আর জুনিয়রে আমি এত সেরাও হইনি। আগামী মার্চে সিনিয়র জাতীয় প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে। ঐ প্রতিযোগিতায় ভালো কিছু করতে হলে তাকে সেভাবেই প্রস্তুত হতে হবে। ভালো পারফরম্যান্স ধারাবাহিকতা বজায় রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ।’

অন্যান্য খেলার প্রতি কখানো ইচ্ছাই জাগেনি শাম্মির। আর ইচ্ছা জাগবেই বা কিভাবে, সে যখন আরো ছোট তখন তার মাকে ক্রীড়া পরিষদের ট্যালেন্ট হান্ট প্রোগ্রামে বিভিন্ন জেলায় যেতে হতো কোচ হিসেবে। তখন ছোট্ট শাম্মিও মায়ের আঁচল ধরে থাকতে হতো মায়ের সাথে সাথেই। তখন থেকেই ভারোত্তোলনে হাতে খড়ি শাম্মির। স্কেল, বেত, লাঠি, কলম দিয়ে হতো তার প্রাথমিক ট্রেনিং। যখন আর একটু বড় হলো তখন নানাবাড়ি গিয়ে ঘটলো মজার ঘটনা। শাম্মির মুখেই শুনা যাক-ওখানে কিছু ছিল না। নানা-নানুকে তো দেখাতে হবে, আমি ওয়েট লিফটিং করতে পারি। অগত্যা ঘরের পর্দার স্টিক খুলে কোলবালিশকে বেঁধে ওয়েট লিফটিং করেছিলাম। সে কথা মনে হলে এখনো হাসি পায়।’

উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী শাম্মি আক্তার। পড়ালেখায়ও ভালো। নিজ ক্লাশে সেরা দশে থাকে। পড়ালেখার ফাঁকে কিংবা পরে যখন অন্যান্য বান্ধবীরা নানারকম সামাজিক মাধ্যমে লেগে থাকে চ্যাট করে তখন আমি ভারোত্তোলন নিয়ে ব্যস্ত থাকি। রাতে আবার স্কুলের হোমওয়ার্কও করি। বান্ধবীরা অনেক সময় আশ্চর্য হয় এত ভার উঠিয়ে ক্লান্ত হই না কেন। তাদেরকে বলি এটাই আমার প্যশন। ভারোত্তোলন নিয়ে আমি অনেক দূর যেতে চাই।’

প্রতিযোগিতায় ভার উঠিয়েই মাকে জড়িয়ে ধরেছিলেন শাম্মি। এমনটা নাকি তিনি ভাবেননি। হঠাৎই মনের অজান্তে হয়ে গেছে। তার কথায়, কি হয়েছে আমি তা বলতে পারব না। ঘোরের মাঝেই হয়েছে। কোনো পরিকল্পনা ছিল না। রেকর্ড হওয়ার পর কি কি করেছি মনে করতে পারছি না। তবে আম্মুর করা ভিডিওতে দেখেছি। আমার এই রেকর্ডে অনেকেই উৎসাহ দিয়েছেন। কেউ কেউ ভবিষ্যতের পথ নির্দেশনাও দিচ্ছেন।’

ছোটকাল থেকেই ভারোত্তোলনে আগ্রহী শাম্মি যখন আরো একটু বড় হলেন, বুঝতে শিখলেন, তখন থেকেই হাতেখড়ি হিসেবে মানতে চান। শুনালেন সে গল্পও। ‘করোনাকালীন সময়ে বিশ^ যখন স্তব্ধ। ঘরে বসে থাকাই ছিল প্রধান কাজ। কোনো কাজ কর্ম নেই। স্কুল নেই, কারো সঙ্গে মেলামেশা নেই, কিচ্ছু নেই। বোরিং হয়ে গিয়েছিলাম। মাকে বললাম, মা- চল ভারোত্তোলনে যাই। অনুশীলন করি। ভালো লাগবে। আমরা করোনা বিধি মেনেই কাজগুলো করতে পারি। আমার আকুতি মা শুনলেন এবং রাজি হলেন। বলতে পারেন তখন থেকেই ভারোত্তোলনে আমার হাতেখড়ি।’

নিজেকে কোথায় দেখতে চান, এমন প্রশ্নে খুব ছোট করেই উত্তর দিলেন শাম্মি। ‘আমি ভারোত্তোলনে সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলতে চাই। যেমন অলিম্পিক-ওয়ার্ল্ড কাপ ইত্যাদি। সে লক্ষ্যে নিজেকে প্রস্তত করতে চাই। সুস্থতা অতীব জরুরি। সেদিকেও খেয়াল রাখতে চাই।’

শাহরিয়া সুলতানা জানালেন অনেক অসঙ্গতির কথা। একজন ভারোত্তোলক নিজেকে গড়তে প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়। যতটুকু ক্যালরি ক্ষয় হয় তা পূরণ করতে না পারলে শরীরে নানারকম অসঙ্গতি দেখা দেয়। কতজন মেয়ে বা ছেলে পারে পর্যাপ্ত পুষ্টি গ্রহণ করতে। এটাও একটা দিক ভারোত্তোলক তৈরি না হওয়া। উচ্চবিত্তদের এগিয়ে আসতে হবে। তাহলেই আধুনিকায়ন হবে ভারোত্তোলন। উইং কমান্ডার মহিউদ্দিন সর্বজনবিদিত। তাকে সরানোর জন্য একটা মহল একসময় তৎপর ছিল। বিশ^ আসরে তখন মহিউদ্দিন ছাড়া অচল হয়ে পড়েছিল। দীর্ঘসময় পর মহিউদ্দিন ও সভাপতি নজরুল ইসলামে হাত ধরে ঘুরে দাঁড়ায় ভারোত্তোলন। সেনাবাহিনী, বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড, আনসার বাহিনী এখন অনেকটাই এগিয়ে এসেছে চাকরি দেওয়ার ক্ষেত্রে।

আনসার ও সেনাবাহিনীর খেলোয়াড়দের মাঝে চরম প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়। স্মৃতি আক্তার, মনিরা কাজী, তানিয়া খাতুন, মাবিয়া আক্তার সীমান্ত সবাই শাহরিয়ার স্টুডেন্ট। সেরা কোচ সেনাবাহিনীর শাহরিয়া সুলতানা সূচী জানান, ‘আপনি কিসের ভরসায় ভারোত্তোলন করবেন। এটাকে প্রফেশন হিসেবে নিতে না পারলে আপনার জীবন কাটবে কিভাবে। এগিয়ে এসেছে সেনাবাহিনী, বিজিবি, আনসারসহ অনেকেই। পারফর্ম করলেই মিলতে পারে চাকরি।’

মেয়েকে নিয়ে অনেক আশাবাদি শাহরিয়া সুলতানা। শুনালেন তার অতীত, ‘পারিপাশির্^কতা নিয়ে তো তার ভাবতে হবে না। তার একমাত্র কাজ হলো পড়ালেখার পাশাপাশি খেলাটাকে রপ্ত করা। আমার সময়ে ট্রাউজার টি-শার্ট পরাটা যেন ছিল অন্যায়। খেলাধুলা করা মেয়েগুলোকে দস্যি হিসেবে আখ্যা দেওয়া হতো। আড় চোখে দেখা হতো। সবাই এমনভাবে দেখতো, মনে হতো চিড়িয়াখানার কোনো জন্তু। সামাজিকভাবে হেয় চোখে তাকাতো। আমি কারো কথা শুনতাম না। গাছে উঠা, সাইকেল চালানো, মাঠে দৌড়ানো উপভোগ করতাম। সাহস পেয়েছিলাম বাবার কাছ থেকে। মা একটু বকাঝকা করলেও বাবা পূর্ণ সাপোর্ট দিয়েছেন। যে কারণে আজ আমি ভারোত্তোলনের শাহরিয়া। আমিও আমার মেয়েকে কোনোরকম বাধা দেই না। তবে হ্যাঁ শালীনতার মাঝে থেকেই তার এগিয়ে যেতে হবে। বড়দের শ্রদ্ধা আর ছোটদের স্নেহ করতে হবে। তার গুরুদের প্রতি শ্রদ্ধা থাকতে হবে আজীবন।’

শুধু শাম্মিই নয়, নতুন প্রজন্মে আরো কয়েকজন আছে যাদেরকে ভবিষ্যতের ভারোত্তোলক হিসেবে ধরা হচ্ছে। উপযুক্ত প্রশিক্ষণ পেলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তারাও ওড়াতে পারবে লাল-সবুজের পতাকা। বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন (বিওএ) আয়োজিত শেখ কামাল ২য় বাংলাদেশ যুব গেমসে ভারোত্তোলন ডিসিপ্লিনে রেকর্ড গড়ে স্বর্ণ জিতেছেন শাম্মী সুলতানা, মো. সোহান ও জয়দেব রায়।

তরুণী বিভাগে ৫৫ কেজি ওজন শ্রেণিতে খুলনা বিভাগের শাম্মী স্ন্যাচ ৫০* ও ক্লিন অ্যান্ড জার্ক ৬২* মিলিয়ে ১১২* কেজি উত্তোলন করে স্বর্ণ জিতেছেন। তরুণ বিভাগের ৬১ কেজি ওজন শ্রেণিতে খুলনা বিভাগের মো. সোহান স্ন্যাচ ৯২* ক্লিন অ্যান্ড জার্ক ৯৭* মিলিয়ে ১৮৭* তুলে স্বর্ণ, ৬৭ কেজি ওজন শ্রেণিতে রংপুর বিভাগের জয়দেব রায় স্ন্যাচ ৯০* ও ক্লিন অ্যান্ড জার্ক ১১৫* মিলিয়ে ২০৫* কেজি তুলে স্বর্ণ জিতেছেন। (*চিহ্ন রেকর্ড বুঝাচ্ছে)।

শাম্মি জানালেন, ‘অনুশীলনে আম্মু এতটুকুও ছাড় দেয় না। একটু ভুল হলেই রক্ষা নেই। এমনভাবে তাকায় যেন খেয়ে ফেলবে। তখন মনে হয় আম্মু অনেক কঠিন। আবার যখন আদর তখন আমার আম্মু বেস্ট মম।’

শাহরিয়া জানালেন, ‘আমার কাছে সব সমান। অনুশীলনে কিংবা ক্যাম্পে কোনো অনুকম্পা নয়। পারফর্ম করেই উপরে উঠতে হয়। অন্য কোনো রাস্তা অবলম্বন করা মানে নিজের সঙ্গে নিজের প্রতারণা। ওদের লেভেলে যারা আছে জয়দেব, সোহান কিংবা শাম্মি সবাইকে কঠোর পরিশ্রম করেই নিজের পথ তৈরি করতে হবে। ওরা সবাই রেকর্ডধারি। নিজেদের রেকর্ড নিজেরাই ভাঙছে। এটা আমাকে প্রেরণা দেয় তাদেরকে আরো ভালো প্রশিক্ষণ দেয়ার।’

জাতীয় পুরস্কারের যোগ্য কারা। এমন প্রশ্নই অনেকবার ঘুরপাক খায় জাতীয় পুরস্কার দেয়ার আগে। যোগ্যরা থেকে যান প্রচ্ছন্নে। অযোগ্যরা চলে আসে প্রচ্ছদে। সিলেকশন কমিটির কারো কারো দহরম মহরমে সুযোগ পায় অযোগ্যরা। আর সার্টিফিকেট ও মেডেল নিয়ে কাঁদেন সত্যিকারের পুরস্কারের যোগ্য খেলোয়াড়েরা। ২০১৮ সালে ভারোত্তোলনে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত দুই শ্রেষ্ঠ মহিলা ভারোত্তোলক মোল্লা সাবিরা ও শাহরিয়া সুলতানাকে বাদ দিয়ে জাতীয় পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছেন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্রোঞ্জপদক জয়ী জেসমিন আক্তার। অথচ তাদের তুলনায় যোজন যোজন পিছিয়ে জেসমিন। জেসমিন যে আসরে ব্রোঞ্জ পেয়েছে সেই আসরে স্বর্ণপদক পেয়েছেন সাবিরা ও শাহরিয়া।

শাহরিয়া জানালেন, ‘এটা কেমন সিস্টেম তা আমার জানা নেই। আমরা যে ঝড় ঝাপটার মাঝে দিয়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছি, তাতে একটা কথাই বলার আছে-পরবর্তী প্রজন্ম যেন এমন বাজে পরিস্থিতির শিকার না হয়। যেটা স্বাভাবিক-সুন্দর-দৃষ্টিকটু নয়-সমালোচনার বাইরে থাকে-এক বাক্যে যেন সবাই শিকার করে যে, যাকে পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে সে আসলেই যোগ্য। এটা শুধু ভারোত্তোলনেই নয়- হোক ক্রীড়ার সব শাখায়।’

 

 

স/মিফা